কোরবানির ফযিলত
বিসমিল্লাহির
রাহমানির রাহিম
সর্বপ্রথম শুকুরিয়া
জানাই মাহান রাব্বিল আলামিনের প্রতি। আর কিছু দিনের মধ্যে আসতেছে মহান আল্লাহ তায়ালার
অশেষ নিয়ামক ও মুসলমানদের গুরুত্বপূর্ণ দিন ঈদ-উল-আযহা। এই দিনে অন্যতম ইবাদত হচ্ছে- আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি পাওয়ার আশায় পশু কুরবানি
করা। সমার্থবান মুসলিমদের উপর কুরবানী করা ওয়াজিব।
কুরবানী শব্দটি
আরবী আদ্হা বা আয্হা শব্দ থেকে এসেছে। ঈদ-উল-আযহা শব্দের আভিধানিক অর্থ পশু উৎসর্গের অনুষ্ঠান। ইসলামি
মতে কুরবানী হচ্ছে নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট ব্যক্তির আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পুরস্কার
লাভের আশায় নির্দিষ্ট পশু জবেহ করা। পবিত্র কোরআন ও হাদিসের একাধিক যায়গায় কুরবানির
কথা উল্লেখ আছে।
কুরআন ও হাদিসের
আলোকে কোরবানিঃ
তোমরা আল্লাহর
উদ্দেশ্যে হজ ও ওমরাহ পূর্ণ করো। কিন্তু যদি তোমরা বাধা পাও তবে সহজলভ্য কোরবানি করো।
আর কোরবানি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত মুণ্ডন করো না। কিন্তু অসুস্থতা বা মাথায়
কোনো রোগের কারণে আগেই মস্তক মুণ্ডন করে ফেললে ‘ফিদিয়া’ বা প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে রোজা
রাখবে, কোরবানি বা সদকা দেবে। নিরাপদ পরিস্থিতিতে কেউ হজের আগে ওমরাহ করে উপকৃত হতে
চাইলে সে সহজলভ্য কোরবানি করবে। কিন্তু যদি কেউ কোরবানির কোনো পশু না পায়, তবে সে হজের
সময় তিন দিন ও ঘরে ফিরে সাত দিন, এভাবে মোট ১০ দিন রোজা রাখবে। মসজিদুল হারামের কাছে
পরিবার-পরিজনসহ বাস করে না এমন লোকদের জন্য এ নিয়ম প্রযোজ্য। অতএব হে মানুষ! আল্লাহ-সচেতন
হও। আল্লাহর ধর্মবিধান লঙ্ঘন হতে দূরে থাকো। জেনে রাখো, আল্লাহ মন্দ কাজের শাস্তিদানে
কঠোর। (সূরা বাকারা, আয়াত ১৯৬)
হে নবী! কিতাবিগণকে
আদমের দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের ঘটনা ভালো করে বর্ণনা করো। তারা যখন কোরবানি করেছিল,
তখন একজনের কোরবানি কবুল হলো। কিন্তু অন্যজনের কোরবানি কবুল হলো না। ক্ষিপ্ত হয়ে সে
বলল, আমি তোমাকে খুন করবো। অপরজন বলল, প্রভু তো শুধু আল্লাহ-সচেতনদের কোরবানিই কবুল
করেন। (সূরা মায়েদা, আয়াত-২৭)
হে নবী! ওদের
বলুন, আমার সালাত, আমার কোরবানি, আমার জীবন, আমার মরণ-আমার সবকিছুই বিশ্বজাহানের প্রতিপালক
আল্লাহরই জন্যে। তিনি একক ও অদ্বিতীয়। এ আদেশই আমি পেয়েছি। আমি সমর্পিতদের মধ্যে প্রথম।’
(সূরা আনআম, আয়াত ১৬২-১৬৩)
আমি প্রত্যেক
সম্প্রদায়ের জন্যে কোরবানিকে ইবাদতের অংশ করেছি। যাতে জীবনোপকরণ হিসেবে যে গবাদি পশু
তাদেরকে দেয়া হয়েছে, তা জবাই করার সময় তারা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে আর সব সময় যেন
মনে রাখে একমাত্র আল্লাহই তাদের উপাস্য। অতএব তাঁর কাছেই পুরোপুরি সমর্পিত হও। আর সুসংবাদ
দাও সমর্পিত বিনয়াবনতদের, আল্লাহর নাম নেয়া হলেই যাদের অন্তর কেঁপে ওঠে, যারা বিপদে
ধৈর্যধারণ করে, নামাজ কায়েম করে আর আমার প্রদত্ত জীবনোপকরণ থেকে দান করে। (সূরা
হজ, আয়াত ৩৪-৩৫)
কোরবানির পশুকে
আল্লাহ তাঁর মহিমার প্রতীক করেছেন। তোমাদের জন্যে এতে রয়েছে বিপুল কল্যাণ। অতএব এগুলোকে
সারিবদ্ধভাবে বাঁধা অবস্থায় এদের জবাই করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করো। এরপর এরা
যখন জমিনে লুটিয়ে পড়ে, তখন তা থেকে মাংস সংগ্রহ করে তোমরা খাও এবং কেউ চাক না চাক সবাইকে
খাওয়াও। এভাবেই আমি গবাদি পশুগুলোকে তোমাদের প্রয়োজনের অধীন করে দিয়েছি, যাতে তোমরা
শুকরিয়া আদায় করো। (সূরা হজ, আয়াত ৩৬)
কিন্তু মনে
রেখো কোরবানির মাংস বা রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, আল্লাহর কাছে পৌঁছায় শুধু তোমাদের
নিষ্ঠাপূর্ণ আল্লাহ-সচেতনতা। এই লক্ষ্যেই কোরবানির পশুগুলোকে তোমাদের অধীন করে দেয়া
হয়েছে। অতএব আল্লাহ তোমাদের সৎপথ প্রদর্শনের মাধ্যমে যে কল্যাণ দিয়েছেন, সেজন্যে তোমরা
আল্লাহর মহিমা ঘোষণা করো। হে নবী! আপনি সৎকর্মশীলদের সুসংবাদ দিন যে, আল্লাহ বিশ্বাসীদের
রক্ষা করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোন বিশ্বাসঘাতক, অকৃতজ্ঞকে পছন্দ করেন না। (সূরা হজ,
আয়াত ৩৭-৩৮)
ছেলে যখন পিতার
কাজকর্মে অংশগ্রহণ করার মতো বড় হলো, তখন ইব্রাহিম একদিন তাকে বলল, ‘হে আমার প্রিয় পুত্র!
আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, তোমাকে কোরবানি দিতে হবে। এখন বলো, এ ব্যাপারে তোমার মত কী?
ইসমাইল জবাবে বলল, হে আমার পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তাই করুন। ইনশাল্লাহ! আল্লাহর
ইচ্ছায় আপনি আমাকে বিপদে ধৈর্যশীলদের একজন হিসেবেই পাবেন।’ (সূরা সাফফাত, আয়াত ১০২)
মনে রেখো, এ
ছিল এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তাকে সুযোগ দিলাম এক মহান কোরবানির। পুরো বিষয়টি স্মরণীয়
করে রাখলাম প্রজন্মের পর প্রজন্মে। ইব্রাহিমের প্রতি সালাম। এভাবেই আমি সৎকর্র্মশীলদের
পুরস্কৃত করি। (সূরা সাফফাত, আয়াত ১০৬-১১০)
অতএব তুমি তোমার
প্রতিপালকের জন্যেই নামাজ পড় ও কোরবানি দাও। নিশ্চয়ই তোমার প্রতি যেই বিদ্বেষ পোষণ
করবে, বিলুপ্ত হবে ওর বংশধারা। (সূরা কাওসার, আয়াত ১০৮)
অতএব প্রতিটি
ধর্মপ্রাণ মুসলিমের কোরবানি হওয়া উচিত পবিত্র কোরআন অনুসরণ করেই।
কাদের জন্য
কোরবানি ওয়াজিবঃ
এক বাক্যে
বলতে গেলে, যার ওপর জাকাত ওয়াজিব, তার ওপর কোরবানিও ওয়াজিব। প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক,
সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন ওই মুসলিম নর-নারীর ওপর কোরবানি ওয়াজিব। যে ১০ জিলহজ ফজর থেকে
১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক
হবে।
নিসাব কী :
সোনার ক্ষেত্রে সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি সোনার মালিক হলেই তাকে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক
বলে গণ্য করা হবে আর রুপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি। টাকা-পয়সা ও অন্যান্য
বস্তুর ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার মূল্যের সমপরিমাণ অর্থ বা এমন প্রয়োজনাতিরিক্ত
জিনিস যার মূল্য সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার মূল্যের সমপরিমাণ বা বেশি হয়।
কারো কাছে যদি
সোনা বা রুপা কিংবা টাকা-পয়সা এগুলোর কোনো একটি পৃথকভাবে নিসাব পরিমাণ নাও থাকে, কিন্তু
প্রয়োজনের অতিরিক্ত একাধিক বস্তু মিলে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার মূল্যের সমপরিমাণ হয়ে
যায় তাহলে তার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। (আল মুহিতুল বুরহানি : ৮/৪৫৫)
যেমন—কারো কাছে
এক ভরি সোনা ও সামান্য কিছু টাকা আছে, যার কোনো একটিও পৃথকভাবে নিসাব পরিমাণ নয়। কিন্তু
এক ভরি সোনার মূল্য ও সামান্য টাকাকে একত্র করলে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার মূল্যের বেশি
হয়ে যায়। যেহেতু এখন সোনার মূল্য অনেক বেশি, তাই কারো কাছে এক ভরির কিছু কম সোনা ও
সঙ্গে কিছু টাকা থাকলেই সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার সমপরিমাণ হয়ে যায়। ফলে তিনি
নিসাবের মালিক বলে গণ্য হবেন এবং তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে।
সাড়ে বায়ান্ন
তোলা রুপার মূল্য কত : বর্তমানে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার দাম কত, এ ব্যাপারে আমিন জুয়েলার্সের
সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা বলে, বর্তমান বাজারে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার দাম ৫৫ হাজার
১১২ টাকা।
উল্লিখিত আলোচনা
দ্বারা বোঝা যায়, আমাদের দেশে অনেক নারীর ওপরই কোরবানি ওয়াজিব, যেহেতু তাদের সবার কাছে
কমবেশি গহনা থাকে। কিন্তু তাদের পক্ষ থেকে কোরবানি দেওয়া হয় না। আবার এমন অনেক পুরুষ
আছেন, যার ওপর মূলত কোরবানি ওয়াজিব নয় (ওয়াজিব তার স্ত্রী/কন্যার ওপর)। কিন্তু তার
পক্ষ থেকেই কোরবানি দেওয়া হয়।
কোরবানির ফজিলত
সম্পর্কে রাসূল সা. ইরশাদ করেন ‘আল্লাহ তায়ালার নিকট কোরবানির দিন মানবজাতির কোরবানি
অপেক্ষা অধিকতর পছন্দনীয় কোনো আমল নেই। বিচার দিনে কোরবানির পশুকে তার শিং, পশম ও
খুরসহ উপস্থিত করা হবে। পশুর রক্ত জমিনে পড়ার পূর্বেই আল্লাহ তায়ালার নিকট তা বিশেষ
মর্যাদায় পৌঁছে যায়, সুতরাং তোমরা আনন্দচিত্তে কোরবানি করো।’ (সহিহ তিরমিযি: ১৩৯১)
পাঠকদের জন্য
আজ থাকছে ‘কোন কোন পশু কোরবানি করা যাবে না’ তবে আসুন জেনে নিই-
১. যে পশুর
কান বা দৃষ্টিশক্তি এক তৃতীয়াংশের কম নষ্ট বা কাটা পড়েছে, তা কোরবানি দেয়া জায়েজ।
এক তৃতীয়াংশ বা তার বেশি হলে জায়েজ নয়।
২. যে পশুর
লেজ অর্ধেকের বেশি আছে তা কোরবানি করতে কোনো অসুবিধা নেই। এর বিপরীত হলে জায়েজ নয়।
৩. যে পশুর
শিং মোটেই ওঠেনি তা কোরবানি দেয়া জায়েজ। যদি শিং গোড়ায় ভেঙে যায় এবং এর ক্ষতি
মস্তিষ্ক পর্যন্ত পৌঁছে তবে তা দিয়ে কোরবানি আদায় হবে না।
৪. যে পশুর
দাঁত মোটেই ওঠেনি বা অর্ধেক পড়ে গেছে তা কোরবানি দেয়া যাবে না।
৫. যে পশুর
জন্মগতভাবে কান নেই তা কোরবানি দেয়া যাবে না।
৬. যে পশুর
জিহবা এ পরিমাণ কাঁটা যে, ঘাস-পাতা খেতে পারে না, তা কোরবানি দেয়া যাবে না।
৭. যে পশু তিন
পা দিয়ে চলে, এক পা মাটিতে রাখতে পারে না বা রাখতে পারে কিন্তু এটি দিয়ে চলতে পারে
না, তা কোরবানি দেয়া যাবে না।
৮. যে পশুর
স্তন কাঁটা বা জখম হওয়ার কারণে বাচ্চাকে দুধ পান করাতে পারে না তা দিয়ে কোরবানি বৈধ
নয়।
৯. জেনেশুনে
চুরিকৃত পশু ক্রয় করা এবং তা কোরবানি করা জায়েজ নয়।
১০. ত্রুটিহীন
পশু ক্রয় করার পর তাতে যদি এমন কোনও ত্রুটি জন্ম নেয়, যা কোরবানি শুদ্ধ হওয়ার জন্য
প্রতিবন্ধক, তবে নেসাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারী ব্যক্তির জন্য এ রূপ পশু দিয়ে কোরবানি
বৈধ নয়, দরিদ্র ব্যক্তির জন্য বৈধ।
১১. গর্ভবতী
পশু কোরবানি করা মাকরুহ।






কোন মন্তব্য নেই