Subscribe Us

ads header

Breaking News

বাংলা নববর্ষের ইতিকথা


বাংলার নববর্ষ মানেই বাঙ্গালীদের বাঙ্গালিয়ানা বাহক। এটি এমন একটি উৎসবমূখর দিন যা দ্ধারা বছরে অনন্ত একটি দিন বাঙ্গালিত্ব ও তিহ্যকে ফুটিয়ে তোলে। আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতার কক্রিট বাঙ্গালী যেখানে নিজের স্বার্থে ও আধুনিকায়নের অজুহাতে বাঙ্গালীর মৌলিকত্ব ক্ষয় করছে তখন এই একটি দিন সকল বাঙ্গালীদের তার তিহ্যের কথা নীবিড় ভাবে স্বরণ করিয়ে দিচ্ছে। এই একটি দিন বাঙ্গালীর শিখরকে আজও জাগ্রত করছে। শুরুতে যেভাবে নববর্ষের রূপ যেভাবে হয়েছিলো তা কালের বিবর্তনে পরিমার্জিত ও অলংকিত হয়েছে। ফলে সৃষ্টি হয়েছে মতবিরোধ, ও রেষারেষি। আবার পহেলা বৈশাখকে ঘিরে চলছে অসমাজিক কার্যক্রম।
আমরা সবাই প্রতি বছরে ১৪ই এপ্রিল ১লা বৈশাখের এই দিনটি পালন করে থাকি। কিন্তু আমরা সবাই কি জানি বা কেউ জানার চেষ্টাও করেছি কি এই পহেলা বৈশাখের ইতিহাস? এদেশের সাম্প্রদায়িক শক্তি বারবার চেষ্টা করেছে বৈশাখের ঐতিহ্যকে রুখে দিতে, তারা ইতিহাসকে ধ্বংস করতে চেয়েছে, তারা “হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি” বলে প্রচার করেছে ।
সকল বাধা বিপত্তি পেরিয়ে এ প্রজন্মের একজন বাঙালীকে বৈশাখ যা শেখায় তা হলো সংগ্রাম করার সংকল্প। বাংলা সংস্কৃতির ওপর কালো থাবা বিস্তারে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার পূর্বপাকিস্তানে রবীন্দ্রসংগীতের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারী করে।

বাংলা সনের ইতিহাসঃ
পাকিস্তান সরকারের এই অন্যায় আচরণের জবাব দিতেই “ছায়ানট” ১৯৬৫ সালের ১৪ এপ্রিল (১লা বৈশাখ, বাংলা ১৩৭২ সন) রমনার বটমূলে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “এসো হে বৈশাখ এসো এসো” গানটি দিয়ে সর্বপ্রথম যাত্রা শুরু করে। বস্তুত এই দিনটি থেকেই “পহেলা বৈশাখ” বাঙালী সংস্কৃতির অন্যতম এক পরিচায়ক রূপ ধারণ করে। ১৯৭২ সালে (বাংলা ১৩৭৯ সন) ‘পহেলা বৈশাখ’ বাংলাদেশের জাতীয় পার্বন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবার আগ পর্যন্ত পাকিস্তান সরকার ২১এ ফেব্রুয়ারীর মতোই থামিয়ে দিতে চেয়েছে বৈশাখের উদযাপন।
ইতিহাস বলে, যার হাত দিয়ে বৈশাখ কিংবা বাংলা নববর্ষের গোড়াপত্তন হয়েছে তিনি কেবল মুসলমানই ছিলেন না বরং সারা মুসলিম বিশ্বে একজন নামকরা, উদারপন্থি শাসক হিসেবে আজও পরিচিত তিনি হচ্ছেন সেই জালালুদ্দিন মুহাম্মদ আকবর।
আমাদের দেশে প্রচলিত বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন মূলত ইসলামী হিজরী সনেরই একটি রূপ। ভারতে ইসলামী শাসনামলে হিজরী পঞ্জিকা অনুসারেই সকল কাজকর্ম পরিচালিত হতো। মূল হিজরী পঞ্জিকা চান্দ্র মাসের উপর নির্ভরশীল। চান্দ্র বসর সৌর বসরর চেয়ে ১১/১২ দিন কম হয়। কারণ সৌর বসর ৩৬৫ দিন, আর চান্দ্র বসর ৩৫৪ দিন। একারণে চান্দ্র বৎসরে ঋতুগুলি ঠিক থাকে না। আর চাষাবাদ ও এজাতীয় অনেক কাজ ঋতুনির্ভর। এজন্য ভারতের মোগল সম্রাট আকবারের সময়ে প্রচলিত হিজরী চান্দ্র পঞ্জিকাকে সৌর পঞ্জিকায় রূপান্তরিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সম্রাট আকবার তার দরবারের বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিদ আমির ফতুল্লাহ শিরাজীকে হিজরী চান্দ্র বর্ষপঞ্জীকে সৌর বর্ষপঞ্জীতে রূপান্তরিত করার দায়িত্ব প্রদান করেন। ৯৯২ হিজরী মোতাবেক ১৫৮৪ খৃস্টাব্দে সম্রাট আকবার এ হিজরী সৌর বর্ষপঞ্জীর প্রচলন করেন। তবে তিনি ঊনত্রিশ বছর পূর্বে তার সিংহাসন আরোহনের বছর থেকে এ পঞ্জিকা প্রচলনের নির্দেশ দেন। এজন্য ৯৬৩ হিজরী সাল থেকে বঙ্গাব্দ গণনা শুরু হয়। ইতোপূর্বে বঙ্গে প্রচলিত শকাব্দ বা শক বর্ষপঞ্চির প্রথম মাস ছিল চৈত্র মাস। কিন্তু ৯৬৩ হিজরী সালের মুহাররাম মাস ছিল বাংলা বৈশাখ মাস, এজন্য বৈশাখ মাসকেই বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস এবং ১লা বৈশাখকে নববর্ষ ধরা হয়।
মোগল সময় থেকেই পহেলা বৈশাখে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে কিছু অনুষ্ঠান করা হতো। প্রজারা চৈত্রমাসের শেষ পর্যন্ত খাজনা পরিশোধ করতেন এবং পহেলা বৈশাখে জমিদারগণ প্রজাদের মিষ্টিমুখ করাতেন এবং কিছু আনন্দ উৎসব করা হতো। এছাড়া বাংলার সকল ব্যবসায়ী ও দোকানদার পহেলা বৈশাখে ‘হালখাতা’ করতেন। পহেলা বৈশাখ এসব কর্মকাণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এটি মূলত: রাষ্ট্রিয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক বিভিন্ন নিয়ম-কানুনকে সুন্দরভাবে সাজিয়ে কাজ-কর্ম পরিচালনার জন্য নির্ধারিত ছিল
যে দিন বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম মাস হয়ে এলো সেদিন হতেই বৈশাখের আনন্দটি নবান্নের আনন্দের চেয়েও আরও বড় আলাদা আঙ্গিক পেতে শুরু করে। মহাজন ও ব্যবসায়ীরা বৈশাখেই ‘হালখাতা’ অনুষ্ঠান চালু করেন। হালখাতা হলো যে বছরটি চলে গেল সেই বছরের হিসাবের যোগ বিয়োগ করে পুরনো খাতাটি তুলে রেখে নতুন বছরের প্রথম দিন নতুন খাতায় হিসাব চালু করা। প্রবীণরা বলেন, লাল সালু কাপড়ের মলাটে মোড়ানো নতুন এই হিসাব খাতায় উপরে লেখা হতো ‘এলাহী ভরসা।’ এই এলাহী শব্দটিও সম্রাট আকবরের ‘তারিখ ই এলাহী’ থেকে এসেছে বলে জানা যায়।
ইতিহাস থেকে জানা আরও জানা যায় যে, আগে বৈশাখের অনুষ্ঠানের চেয়ে চৈত্র সংক্রান্তির অনুষ্ঠান ছিল আকর্ষণীয়। এই রেশ ধরেই বৈশাখের পদার্পণ। এখনও চৈত্রের শেষ দিনে গাঁয়ের বধূরা বাড়ি ঘর পরিষ্কার করে। বিশেষ করে পানিতে মাটি ছেনে ঘরের ভিতরে ও আঙ্গিনায় লেপে দেয়। উঠান ঝকঝকে পরিষ্কার করে রাখে।
বঙ্গাব্দের বারো মাসের নামকরণঃ
বঙ্গাব্দের বারো মাসের নামকরণ করা হযেছে নক্ষত্রমন্ডলে চন্দ্রের আবর্তনে বিশেষ তারার অবস্থানের উপর ভিত্তি করে । বাংলা মাসের এই নামগুলি হচ্ছেঃ
• বৈশাখ – বিশাখা নক্ষত্রের নাম অনুসারে
• জ্যৈষ্ঠ – জ্যেষ্ঠা নক্ষত্রের নাম অনুসারে
• আষাঢ় – উত্তর ও পূর্ব আষাঢ়া নক্ষত্রের নাম অনুসারে
• শ্রাবণ – শ্রবণা নক্ষত্রের নাম অনুসারে
• ভাদ্র -উত্তর ও পূর্ব ভাদ্রপদ নক্ষত্রের নাম অনুসারে
• আশ্বিন – অশ্বিনী নক্ষত্রের নাম অনুসারে
• কার্তিক – কৃত্তিকা নক্ষত্রের নাম অনুসারে
• অগ্রহায়ণ(মার্গশীর্ষ) – মৃগশিরা নক্ষত্রের নাম অনুসারে
• পৌষ – পুষ্যা নক্ষত্রের নাম অনুসারে
• মাঘ – মঘা নক্ষত্রের নাম অনুসারে
• ফাল্গুন – উত্তর ও পূর্ব ফাল্গুনী নক্ষত্রের নাম অনুসারে
• চৈত্র – চিত্রা নক্ষত্রের নাম অনুসারে
সম্রাট আকবর কর্তৃক প্রবর্তিত তারিখ-ই-ইলাহী-র মাসের নামগুলি প্রচলিত ছিল পারসি ভাষায়, যথা: ফারওয়াদিন, আর্দি, ভিহিসু, খোরদাদ, তির, আমারদাদ, শাহরিযার, আবান, আযুর, দাই, বহম এবং ইসক্নদার মিজ।
বাংলা দিনের নামকরণঃ
বাংলা সন অন্যান্য সনের মতোই সাত দিনকে গ্রহণ করেছে এবং এ দিনের নামগুলো অন্যান্য সনের মতোই তারকামন্ডলীর উপর ভিত্তি করেই করা হয়েছে।
• সোমবার হচ্ছে সোম বা শিব দেবতার নাম অনুসারে
• মঙ্গলবার হচ্ছে মঙ্গল গ্রহের নাম অনুসারে
• বুধবার হচ্ছে বুধ গ্রহের নাম অনুসারে
• বৃহস্পতিবার হচ্ছে বৃহস্পতি গ্রহের নাম অনুসারে
• শুক্রবার হচ্ছে শুক্র গ্রহের নাম অনুসারে
• শনিবার হচ্ছে শনি গ্রহের নাম অনুসারে
• রবিবার হচ্ছে রবি বা সূর্য দেবতার নাম অনুসারে
বাংলা সনে দিনের শুরু ও শেষ হয় সূর্যোদয়ে । ইংরেজি বা গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জির শুরু হয় যেমন মধ্যরাত হতে ।
বাংলা সনের সংস্কারঃ
সন একটি আরবী শব্দ। পবিত্র কোরআন মজিদে সূরা আনকাবুত এ সানা বা বছর সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে এই সানা শব্দের পরিবর্তিত রূপই সন। আর সাল শব্দটি উর্দু ও ফার্সী ভাষায় ব্যবহৃত হয়। বাংলায় সনকে অব্দ বা সাল নামে অভিহিত করা হয়। বাংলা একাডেমী কর্তৃক বাংলা সন সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয় ১৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৬ সালে। ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’র নেতৃত্বে এ কমিটি বিভিন্ন বাংলা মাস ও ঋতুতে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আর্থ-সাংস্কৃতিক জীবনে কিছু সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতাকে নির্ণয় করে সেগুলো হতে উত্তরণের প্রস্তাবনা প্রদান করেন । বাংলা সনের ব্যাপ্তি গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জির মতোই ৩৬৫ দিনের। যদিও সেখানে পৃথিবীর সূর্যকে প্রদক্ষিণের পরিপূর্ণ সময়কেই যথাযথভাবে নেয়া হয়েছে। এ প্রদক্ষিণের মোট সময় ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট এবং ৪৭ সেকেন্ড। এই ব্যবধান ঘোচাতে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে প্রতি চার বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে একটি অতিরিক্ত দিন যোগ করা হয়। ব্যতিক্রম হচ্ছে সে শতাব্দীতে যে শতাব্দীকে ৪০০ দিয়ে ভাগ করা যায় না বা বিভাজ্য নয় । জ্যোতির্বিজ্ঞান নির্ভর হলেও বাংলা সনে এই অতিরিক্ত দিনকে আত্মীকরণ করা হয়নি। বাংলা মাস অন্যান্য সনের মাসের মতোই বিভিন্ন পরিসরের হয়ে থাকে। এই সমস্যাগুলোকে দূর করার জন্য ডঃ মুহম্মদ শহীদূল্লাহ কমিটি বাংলা একাডেমীর কাছে কতকগুলো প্রস্তাব পেশ করে। এগুলো হচ্ছেঃ-
• বছরের প্রথম পাঁচ মাস অর্থাৎ বৈশাখ হতে ভাদ্র হবে ৩১ দিনের;
• বাকী মাসগুলো অর্থাৎ আশ্বিন হতে চৈত্র হবে প্রতিটি ৩০ দিনের মাস;
• প্রতি চতুর্থ বছরের ফাল্গুন মাসে অতিরিক্ত একটি দিন যোগ করে তা হবে ৩১ দিনের।
১লা বৈশাখ কি হাজার (১০০০) বছরের ঐতহ্যঃ
অনেকে বলে ১লা বৈশাখ নাকি হাজার (১০০০) বছরের ঐতিহ্য, আমি তাদের কে বলব নিচের তথ্যটি দেখুন, ৯৬৩ হিজরী সাল থেকে বঙ্গাব্দ গণনা শুরু, আগামী কাল ১৪২০ সাল শুরু হচ্ছে, শুরু থেকে বর্তমান কালের পার্থক্য (১৪২০ – ৯৬৩=৪৫৭ বছর)। তাহলে হাজার (১০০০) বছরের ঐতিহ্য হয় কি?

পহেলা বৈশাখ যেভাবে বিতর্কিতঃ
উৎসব সবসময় শুভ ও কল্যাণকর। আর পহেলা বৈশাখ এমন একটি উৎসব যেখানে বাঙ্গালীর মৌলিকত্ব প্রকাশ প্রায়। ইতিহাস বলে এটি কোনো ধর্মভিত্তিক উৎসব নয়। শুরুতে এই উৎসব রাজা-প্রজা, মালিক-কর্মচারী ও দেনাদার-পাওনাদারদের মিলন অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ ছিলো। পহেলা বৈশাখ তখনকার দিনে ব্যবসায়ীদের দিন হিসেবেই গণ্য করা হতো।
পরবর্তিতে হিন্দু ব্যবসায়ীরা মা কালীর চরণে পুরুত ঠাকুর সেসব খাতা ছুঁইয়ে দিতেন, গদিতে তেল সিঁদুর দিয়ে ঋত্বিক এঁকে দিতেন। হালখাতা ছিল সেই উৎসবের নাম। সন্ধেবেলা মুদি দোকান, গয়নার দোকানে হালখাতার নেমন্তন্ন থাকত। বাড়ির বড়দের সঙ্গে গিয়ে মিষ্টি আর রঙিন শরবত খাওয়া চলত।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বোনঝি অর্থাৎ স্বর্ণকুমারী দেবীর কন্যা সরলা দেবী চৌধুরানীও স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন- তখন ঠাকুরবাড়িতে ১১ই মাঘ ছাড়া কোনো উৎসব ছিল না। কিন্তু পরবর্তীকালে এই ঠাকুরবাড়ি থেকেই পহেলা বৈশাখ, নবান্নের উৎসবসহ নানারকম পালাপার্বণ ও বিবিধ কৃষ্টি কালচার উদযাপনের উৎপত্তিস্থল হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেয়।
এর পেছনে বড় একটি কারণ হল সে আমলে কলকাতার জোড়াসাঁকোতে ঠাকুর পরিবারটি সমাজ থেকে ছিল অনেকটা বিচ্ছিন্ন ও একঘরে। কেন? সে প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি।
আমাদের সমাজের অনেক শিক্ষিত লোকই হয়তো জানেন না যে, জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার আসলে হিন্দু ছিলেন না। ছিলেন ব্রাহ্মধর্মের অনুসারী। ব্রাহ্মধর্ম একটি নতুন ধর্ম।
ধর্মটির গোড়াপত্তন করেছিলেন মূলত রাজা রামমোহন রায়। সঙ্গে তার সহযোদ্ধা ছিলেন রবীন্দ্রনাথের পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, প্রসন্ন কুমার ঠাকুর, কালীনাথ রায় ও আরও অনেকে।
ব্রাহ্মধর্মের মূল ভিত্তি ছিল পৌত্তলিকবিরোধিতা ও একেশ্বরবাদে বিশ্বাস। ব্রাহ্মধর্মের অনুসারীদের মূল উদ্দেশ্য ছিল একেশ্বরবাদকে বিশ্বজনীন হিসেবে প্রচলন করা। সেদিক থেকে বিচার করলে ব্রাহ্মধর্মটি কিন্তু খ্রিস্টান ও ইসলাম ধর্মের অনেক কাছাকাছি।
রাজা রামমোহন রায় ও প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ছিলেন এ দুটি ধর্মের প্রতি প্রচ্ছন্নভাবে অনুরক্ত। বলাই বাহুল্য যে, এরা দু’জনই আরবি ও ফারসি ভাষাগুলোতে এতটাই পণ্ডিত ছিলেন যে, সে সময়ের আরবি ও ফার্সিতে দক্ষ বহু মুসলমান মাওলানারাও এদের দু’জনের সমকক্ষ ছিলেন না। পাঠকদের মধ্য থেকে কেউ যদি জোড়াসাঁকোতে গিয়ে থাকেন তাহলে নিশ্চয়ই দেখে থাকবেন যে, ঠাকুরবাড়ির প্রবেশ মুখে মাঝারি গোছের একটি উপাসনালয় আছে। ব্রাহ্মধর্মের ওই উপাসনালয়টি কিন্তু দেখতে অনেকটা মসজিদের মতো।
মসজিদের যেমন সামনের দিকে কেবলা মুখ করে একটি মিহরাব থাকে সেরকম আর কী। আবার সেই মিহরাবে মাওলানারা মিমবারে বসে যেমন খুতবা পাঠ করেন, আমি নিজ চোখে দেখেছি ঠাকুরবাড়ির সেই উপাসনালয়ে সে রকম একটি মিমবারও আছে সিমেন্টের তৈরি। আমার ধারণা মিমবারের ওই বেদিতে বসেই সে সময় ব্রাহ্মধর্মের বইপুস্তক পাঠ করা হতো।
সে যাক, এই ধর্মগত কারণেই ঠাকুর পরিবারটি ছিল হিন্দু সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন। একটি কথা মনে রাখা দরকার যে, সে সময়ের হিন্দু সমাজ ছিল অনেক গোঁড়া ও কট্টর। হিন্দু ধর্মের লোকজন অন্য ধর্মের লোকজনের সঙ্গে ওঠা-বসা, সমাজ-আমাজ করা তো অনেক দূরের কথা স্বয়ং নিজ ধর্মের নীচু জাতের লোকজনের ছায়া পর্যন্ত তারা মাড়াতেন না কখনও।
দৈবাৎ সে রকম কিছু ঘটলে তাদের জাত যেত। এ জন্য কলকাতার সে সময়ের অন্যতম সেরা ধনী হওয়া সত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিবারের সঙ্গে তখনকার সমাজের লোকজনদের ওঠা-বসা, চলন-বলন হতো খুবই কম। ফলশ্রুতিতে ঠাকুরবাড়ির লোকজন নিজেদের নিয়োজিত রেখেছিল নানারকম সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে।
গানবাজনা, নাটক মঞ্চায়ন, পত্রিকা প্রকাশ, পোশাক-পরিচ্ছদ-ফ্যাশন সব কিছুতে ছিল তাদের নব-নব সব উদ্যোগ। ফলে একসময় দেখা গেল ঠাকুরবাড়ির লোকজন যা-ই করছে না কেন পুরো কলকাতার মানুষ সেগুলোই অনুসরণ ও অনুকরণ করতে থাকে। একটি দৃষ্টান্ত দিচ্ছি- এই যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ সেকালের সবার মুখে লম্বা লম্বা দাড়ি রাখার প্রবণতা দেখি সেটিও কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরই প্রথম প্রচলন করেছিলেন।
একবার ঠাকুরবাড়িতে যাত্রা হবে নাম- ‘নববাবুবিলাস’, সেখানে ঠাকুরবাড়ির সবাইকেই কিছু না কিছু অভিনয় করতে হবে। ঈশ্বরচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, ইনি আবার মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটবেলার বন্ধু তাকে বলা হল দারোয়ান সাজতে হবে।
তাও আবার পরচুলা-টরচুলা পরে নয় আসল দাড়ি-গোঁফ গজিয়ে। তখন দাড়ি রাখার কোনো ফ্যাশন ছিল না। সবাই গোঁফ রাখতেন কিন্তু দাড়ি কামিয়ে ফেলতেন।
ঈশ্বরবাবু বলতে শুরু করলেন- আমি তো দাড়ি গজাতে শুরু করলুম, মাঝখানে সিঁথি কেটে দাড়ি ভাগ করে গালের দু’দিক দিয়ে কানের পাশ অবধি তুলে দিই। সেই আমার দেখাদেখি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর দাড়ি রাখলেন।
দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের যেই-না দাড়ি রাখা, কী বলব ভাই, দেখতে দেখতে সবাই দাড়ি রাখতে শুরু করলে, আর দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো সোনার চশমা ধরল। সেই থেকে দাড়ি আর সোনার চশমার একটা চল শুরু হয়ে গেল। শেষে ছোকরারা পর্যন্ত দাড়ি আর চশমা ধরল। এবার বুঝলে তো ভাই কোত্থেকে এই দাড়ির উৎপত্তি? এই বলে ঈশ্বরবাবু খুব গর্বের সঙ্গে বুকে হাত দিয়ে নিজেকে দেখাতেন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে পহেলা বৈশাখ নিয়ে কিছু মানুষের মধ্যে কেন সৃষ্টি হয়েছে বিভ্রান্তি। আমি মনে করি এর সঙ্গে দুটি দিক জড়িত। প্রথমত অনেক কট্টর ও গোঁড়া মুসলমানদের ধারণা পহেলা বৈশাখ হিন্দু ধর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
আসলে বিষয়টি কিন্তু আদৌ সত্য নয়। সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেছিলেন খাজনা আদায়ে সুবিধা ও সুষ্ঠুতার জন্য। সম্রাটের আদেশে তৎকালীন বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেউল্লাহ সিরাজি সৌরসন শকাব্দ ও আরবি হিজরি এ দুটি সনের মিশ্রণে নতুন বাংলা সন বিনির্মাণ করেছিলেন।
এখন আমাদের সামনে প্রশ্ন আসতে পারে খাজনা আদায়ের জন্য নতুন একটি সনের প্রয়োজন কেন অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল। মোগল সম্রাট আকবরের আমলে খাজনা আদায় করা হতো আরবি হিজরি সন অনুযায়ী অথচ ফসল উৎপাদিত হতো সৌরসন অনুযায়ী। আমরা সবাই জানি যে, হিজরি সন হল চাঁদের হিসাবে।
হিজরি চান্দ্রসন হওয়ায় এ সনের দিনের সংখ্যা ৩৫৪। অন্যদিকে সে সময়ের শকাব্দ নামে যে সৌরসন ছিল, দিনের হিসাবে সেটা-৩৬৫। অর্থাৎ চান্দ্রসন সৌরসনের চেয়ে ১১ দিন কম।
এই জন্যই আমরা দেখি প্রতিবছর রোজা কিংবা ঈদ নির্ধারিত দিনের চেয়ে ১১ দিন কমে আসে। ফলে ঈদ কখনও কনকনে শীতে আবার কখনও কাঠফাটা গ্রীষ্মে উদযাপিত হয়।
ফসল চক্র সৌরসনের রীতি মেনে চলায় আদায়কৃত খাজনার হিসাব ও রাজকোষ মিলাতে গরমিল হতো। দেখা যেত হিজরি সনের যে মাসে যে ফসলে খাজনা হিসেবে জমা হয়েছে সেই একই মাসে তিন চার বছর পর অন্য ফসল জমা হয়েছে।
যেমন তিন বছর আগে মহররম মাসে আউশের ফসল আউশ ধান জমা হয়েছে (ঋতুভিত্তিক মাস শ্রাবণ) তিন বছর পর মহররম মাস এসেছে ঋতুচক্রে আষাঢ়ে। তখন মহররম মাসে তিলের ফসলের খাজনা জমা হয়েছে। আবার হিজরি সনের মাস নির্দিষ্ট রেখে খাজনা আদায় করতে হলে কোনো কোনো সময় দেখা যেত তা ফসল বপনের সময়, কর্তনের সময় নয়।
বাংলা সন গণনা শুরু হয় মোগল সম্রাট মহামতি আকবরের সিংহাসনের বছর থেকে আর সেটি ছিল ৯৬৩ হিজরি খ্রিস্টাব্দ মতে ১৫৫৬। তবে এ গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আরও কিছুটা পেছন থেকে।
এখানে জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেহউল্লাহ সিরাজি আর একটি অদ্ভুত কাজ করেন- ৯৬৩ হিজরিতে কাগজ কলমে বাংলা সনকে কার্যকরী দেখালেও আরবি হিজরি সনের ৯৬৩ বছরও নতুন জন্ম হওয়া এই বাংলা সনের সঙ্গে যোগ করে দেন। ফলে বাংলা সনটি জন্মানোর সঙ্গে সঙ্গে এর বয়স হয় ৯৬৩ বছর।
ফতেহউল্লাহ হিজরি ও বাংলা সনের বয়স একই রেখেছিলেন সম্ভবত এ কারণে যে এ দুটি সনই যেন সমগতিতে একসঙ্গে চলতে পারে। কিন্তু তার মাথায় এ বিষয়টি এসেছিল কিনা আমি বলতে পারব না।
হিজরি বছর চান্দ্রসন হওয়ায় সেটা হয় ৩৫৪ দিনে আর বাংলা সন সৌর সন হওয়ায় সেটি ৩৬৫ দিনে ফলে হিজরি সন প্রতি বছর ১১ দিন করে কমে আসে আর সে জন্য বর্তমানে বাংলা সনের চেয়ে হিজরি সন ১৭ বছর অগ্রগামী।
বর্তমানে হিজরি সন হচ্ছে ১৪৩৮ অন্যদিকে বর্তমানে বাংলা সন চলে ১৪২৩। বাংলা সনটি হিজরি হিসাব মতো হলেও সিরাজি সাহেব মাসের নামগুলো কিন্তু ধার করেছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের বহুল প্রচলিত এক প্রাচীন সৌরঅব্দ-‘শকাব্দ’ থেকে।
শকাব্দ সনের জন্ম হয়েছিল প্রাচীন এক নৃপতি শালীবাহনের প্রয়াণ দিবসকে উপলক্ষ করে। শকাব্দ সনটি চালু হয় খ্রিস্টাব্দ থেকে ৭৮ বছর পর। অর্থাৎ শকাব্দ নামের এই সনটি খ্রিস্টাব্দের চেয়ে ৭৮ বছরের ছোট। তবে শকাব্দে ব্যবহৃত মাসের বেশিরভাগই খ্রিস্টপূর্ব চার হাজার বছর আগে বিশেষ করে বৈদিক যুগে প্রাচীন জ্যোতির্বিদদের দেয়া ২৭টি নক্ষত্রের নাম থেকে ধার করা।
২৭টি নক্ষত্রের কয়েকটির নাম এ রকম- চিত্রা, বিশাখা, অশ্বিনী, পৌষী ইত্যাদি। এসব নিয়ে নানারকম মিথও চালু আছে প্রাচীন সাহিত্যে। পুরাণ মতে চিত্রাসহ মোট ২৭টি নক্ষত্র হচ্ছে দক্ষ প্রজাপতির সুন্দরী কন্যা।
বাংলা সনের শেষ মাস চৈত্রের নামকরণ করা হয়েছে এই চিত্রা নক্ষত্রের নাম অনুসারে। প্রবাদতুল্য সুন্দরী এই কন্যাদের বিয়ে দেয়ার চিন্তায় ভারি উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠলেন দক্ষ প্রজাপতি। উপযুক্ত পাত্রী চাই।
কোথায় পাওয়া যায় সে রকম পাত্র। তাহলে কি অনূঢ়াই থেকে যাবে তারা? অবশেষে পাওয়া গেল সেই উপযুক্ত পাত্র। একদিন মহাধুমধামে চন্দ্রদেবের সঙ্গে বিয়ে হল দক্ষের ২৭ কন্যার। দক্ষের এ ২৭ কন্যার মধ্যে অনিন্দ সুন্দরী অথচ খরতাপময় মেজাজ সম্পন্ন একজনের নাম বিশাখা। এই বিশাখা নক্ষত্রের নাম অনুসারেই বাংলা সনের প্রথম মাস বৈশাখের নামকরণ।
এ প্রসঙ্গে স্বভাবসিদ্ধভাবেই আরেকটি বিষয় সামনে চলে আসে। যদি হিজরি সন মেনেই বঙ্গাব্দ সনটি চালু হয়ে থাকে তাহলে বৈশাখকেই বা কেন বছরের প্রথম মাস হিসেবে গণনা করতে হল।
এরও যথার্থ এবং বিজ্ঞানসম্মত একটি উত্তর রয়েছে তবে এর আগে অন্য প্রসঙ্গে একটু করে বলতে হয়। প্রাচীনকালে ভারতীয় এ উপমহাদেশে একেক অঞ্চলে একেক মাসে নববর্ষ উদযাপিত হতো।
যেমন বৈদিক যুগে সম্ভবত নববর্ষ হতো অগ্রহায়ণ মাসে, কেন? এর উত্তর নিহিত আছে এর নামের মধ্যেই। অগ্র-অর্থ হচ্ছে আগে আর হায়ন মানে হচ্ছে বছর। অর্থাৎ অগ্রহায়ণ মানে হচ্ছে বছরের শুরুর যে মাস।
উত্তর ভারতে এখনও নববর্ষ পালিত হয় চৈত্র মাসের শুক্লা প্রতিপদে। বিশিষ্ট লেখক শ্রী যোগেশচন্দ্র রায় মহাশয়ের মতে অতি প্রাচীনকালে ফাল্গুনী পূর্ণিমা তিথিতে নববর্ষোৎসবের অনুষ্ঠান হতো। বঙ্গাব্দ সনের শুরু বৈশাখ মাস দিয়ে এর কারণ যেদিন থেকে বঙ্গাব্দের গণনা শুরু হয়েছিল অর্থাৎ ৯৬৩ হিজরির প্রথম মাস জমাদিউল আওয়াল ছিল বৈশাখ মাসে।
আর এ কারণেই বাংলা সনের প্রথম মাস হয়ে গেল বৈশাখ। এর সঙ্গে হিন্দু কিংবা অন্য ধর্মের কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা নেই। এ প্রসঙ্গে চিন্তাহরণ চক্রবর্তী তার ‘হিন্দুর আচার-অনুষ্ঠান’ গ্রন্থের ৮৭ পৃষ্ঠায় লিখেছেন- ‘বাঙালি সাধারণ হিন্দু গৃহস্থের মধ্যে পহেলা বৈশাখ নববর্ষের সূচনায় বিশেষ কোনো শাস্ত্রীয় বা লৌকিক অনুষ্ঠানের প্রচলন নেই।
যেসব গ্রন্থের দ্বারা আমাদের ধর্মানুষ্ঠান নিয়ন্ত্রিত হয় তাহাদের মধ্যে নববর্ষ প্রসঙ্গে কোনোরূপ ধর্মানুষ্ঠানের বিধান দেখিতে পাওয়া যায় না। পঞ্জিকায় এ সম্পর্কে যে শাস্ত্রীয় নির্দেশ উদ্ধৃত হইয়া থাকে তাহার উৎস অজ্ঞাত।’
আরেকটি বিষয় মনে রাখা বিশেষভাবে প্রয়োজন যে- হিন্দু সম্প্রদায় ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি সন অনুসরণ করে পালন করে না। তাদের অনুষ্ঠানাদি পালিত হয় রাশিচক্রের নক্ষত্র ও চন্দ্রের তিথি গণনায়। এ ক্ষেত্রে তাদের পূজা-পার্বণ শকাব্দ অনুসারী।
সম্রাট আকবর এ সন প্রবর্তন করলেন রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যবহার্য খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানাদি পালনে বাংলা সন অনুসরণে তাদের কখনও বাধ্য করা হয়নি।
পহেলা বৈশাখকে হিন্দু ধর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার আরেকটি কারণ হয়তোবা আমার মতে- হিন্দুদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান চৈত্রসংক্রান্তি উদযাপন। কারণ চৈত্রসংক্রান্তি পালন করা হয় চৈত্র মাসের একেবারে শেষ দিন।
আর তারপরই আসে পহেলা বৈশাখ। মুসলমানদের মধ্যে কতজন এটা জানেন আমি ঠিক বলতে পারব না। হিন্দু ধর্মে প্রায় প্রতি মাসের শেষেই একটি করে সংক্রান্তি পালিত হয়। যেমনম- চৈত্র, আশ্বিন, ভাদ্র, অগ্রহায়ই, পৌষ প্রভূত সংক্রান্তি এবং প্রতিটি সংক্রান্তিতেই পূজা-পার্বণের ব্যবস্থা থাকে। যেমন চৈত্র সংক্রান্তিতে ছাতুদান ও ছাতু খাওয়ার উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।
আশ্বিনসংক্রান্তিতে চাষীরা প্রত্যুষে কাঁচা হলুদ বাটা সরষের তেলের সঙ্গে মিশিয়ে ধানের ক্ষেতে ছিটিয়ে দিয়ে বলে- ধান রে সাধ খা/পাইক্যা ফুইল্যা ঘরে যা। আসলে সংস্কৃতি বিষয়টি বেশ গোলমেলে ও জটিল একটি বিষয়।
এসব বললেই তো অনেকে আমার নিন্দেমন্দ করবেন তারপরও বলছি। এই যে আমরা প্রতিবছর শীত মৌসুমে দলবেঁধে গাড়ির বহর সাজিয়ে বনভোজনে যাই, কেউ কি বলতে পারেন কোত্থেকে এসেছে এই সংস্কৃতি।
পৃথিবীর অন্য কোথাও কি এভাবে বনভোজন করার রীতি আছে? না নেই। এটা এসেছে হিন্দু পৌষসংক্রান্তি উদযাপন থেকে। লেখক চিন্তাহরণ চক্রবর্তী তার ‘ধর্ম সংস্কৃতি সমাজ’ বইটিতে লিখেছেন- পৌষ মাসের সংক্রান্তির দিনের পৌষপার্বণই সবচেয়ে বেশি প্রসিদ্ধ।
এ উপলক্ষে নানা স্থানে নানারূপ খুঁটিনাটি অনুষ্ঠানের প্রচলন দেখা যায়। ছেলেরা বাড়ি বাড়ি ঘুরিয়া হোলবোল, কুলাইর ছড়া, বাঘের বয়াত গান করে এবং খাদ্যদ্রব্য সংগ্রহ করিয়া ‘পৌষালা’ বনভোজনের ব্যবস্থা করে। আবার অন্যদিকে লেখক দীনেশচন্দ্র সেন থেকে শুরু করে সুকুমার সেনসহ বহু পণ্ডিতদের মতে হিন্দু ধর্মের অনুসারীরা এই যে উলুধ্বনি দেন এটি তারা ধার করেছেন মুসলমানদের কাছ থেকে। এ ধরনের আরও বহু দৃষ্টান্ত আমি এখানে দিতে পারি।
তাহলে পহেলা বৈশাখ নিয়ে কেন এত বিতর্ক। আমার মতে এর প্রধান কারণ সম্ভবত, দেশের কতিপয় বুদ্ধিজীবী মহল গির্জা, মন্দির, প্যাগোডায় গিয়ে তাদের প্রগতিশীলতা জাহির করতে এতটুকু কুণ্ঠাবোধ করেন না।
কিন্তু ইসলামিক কোনো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করলেই মনে হয় যেন তাদের সব প্রগতিশীলতা উবে যায়। তাদের এ ধরনের হীনমন্যতা ও বিবেকবোধহীন কর্মকাণ্ডের জন্যই যে অনুষ্ঠানটি উদযাপিত হওয়ার কথা ছিল সার্বজনীনভাবে অথচ সেটি আজ প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত।
আরেকটি কথা, ধর্মকে বাদ দিয়ে কী কখনও সংস্কৃতি হয়? সেটি হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ যে ধর্মের কথাই আমরা বলি না কেন। আগেই আমি লেখিকা কল্যাণী দত্তের কথা উল্লেখ করেছি। ভারতের কলকাতায় কি মুসলিম রীতিতে নববর্ষ উদযাপিত হয়?
যে দেশের ৮০ শতাংশের বেশি মুসলমান সেখানে পহেলা বৈশাখকে সার্বজনীন করতে হলে ইসলাম ধর্মের কিছু অনুসঙ্গ সম্পৃক্ত করার কথা ভাবা যেতে পারে- এ উৎসবটির সঙ্গে, তা না হলে এটিকে কোনোদিনও সার্বজনীন করা যাবে না। ফলে আমরা চাই বা না চাই জাতিগত বিভক্তি দিন কে দিন বেড়েই চলবে।

কোন মন্তব্য নেই