জীবন সংগ্রামে অদম্য পথিক মো রকিবুল ইসলাম
শারীরিক
প্রতিবন্ধকতাকে বাঁধা না ভেবে দৃড় সংকল্পে সামনের দিকে এগিয়ে চলা এবং সমাজে অন্যান্যদের
অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে যাচ্ছে হার না মানা যুবক মোঃ রকিবুল ইসলাম ওরফে
ই এইচ এম রকিবুল ইসলাম। তিনি ফরিদপুর সদর উপজেলার অম্বিকাপর ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ডের
খালাসী দুর্গাপুর গ্রামের নিবাসী মোঃ হাসমত আলী মাস্টার ও ইয়াসমিন আক্তারের একমাত্র
সন্তান।
সে
জন্ম থেকে শারীরিক ও মৃদু বাঁক প্রতিবন্ধকতার স্বীকার। তথাপিও সে অন্যের বোঝা হয়ে বাঁচতে
পছন্দ করেনা। সে নিজের যেটুকু স্ক্ষমতা রয়েছে- তা ব্যবহার করে জীবন সংগ্রাম চালিয়ে
যেতে চান। তার জীবনের গল্প থেকে এর দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।
সময়টি
ছিলো ঈদ-উল-ফিতরের
পরের দিন। হাসপতালের সব ডাক্টার ছিলো ঈদের ছুটি কাঁটাচ্ছেন। এমন সময়ে
তার পৃথিবীতে আগমেনর ডাক আছে। তখন হাসপতাল কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে ফর্সেপ
ডেলেভারির মাধ্যমে তার জন্ম হয়। আর জুন মাসে খরতাপ প্রবাহে তার জীবন হয় উত্তপ্ত।
জন্মের পর তার জ্ঞান ফিরে না। তাকে
রাখা হয় কাঁচের সেপটি গ্লাসের ভিতর। সবাই ভেবেছিলো সে আর বাঁচবে না। কিন্তু মহান আল্লাহ
তাআলার কৃপায় সে মৃতযাত্রা থেকে তখন বেঁচে যায়। কিন্তু কিছুটা মৃত স্বাধ এখনো তাকে
বোধ করতে হয়। কিন্তু তখনো তার স্বজনরা বুঝে উঠতে পারিনি যে; সে একজন প্রতিবন্ধকতার
স্বীকার।
তার
বয়স যখন ছয় কিংবা সাত মাস, তখন তার কাছের মনুষগুলো লক্ষ্য করতে শুরু করলো যে, সে স্বাভাবিক
না। তখন থেকে তার মা বাবা ও নানু আছিয়া বেগম তার চিকিৎসা করতে শুরু করলো। এর পর থেকে
তারা ডাক্টার, কবিরাজ, ফকির, দরবেশ যখন যার কথা শুনে তার কাছে যায়। পরিশেষে ঢাকার পঙ্গু
হাসপতালের চিকিৎসক রকি’র বাবাকে জানিয়ে দেন যে, তার কোন চিকিৎসা নেই। কেস গল্প থেকে
বলেন যে; জন্মের সময় ফর্সেফ ডেলেভারির কারণে তার মাথার ডান পাশে আঘাত লাগে। ফলে তার
ডান পাশ অস্বাভাবিক হয়ে পরে এবং তার ব্রেন্টে ক্ষতি হয়। তবে বয়স বাড়ার সাথে সাথে তার
শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হবে। আর এ কথার উপর ভিত্তি করে রকি’র বাবা মা ও নানু
আছিয়া বেগম জীবন সংগ্রামে সহযোদ্ধা হন।
তার
বয়স তখন ছয় বছর। সে তখনও হাঁটতে পারে না। কিন্তু হামাগুরি দেয়। তখন তার মা ইয়াসমিন
আক্তার ইন্টারমিডিয়েটে পরে। তখন লক্ষ্য করা যায় সে তা মা’র পড়ার টেবিলের পাশে বসে বই
নাড়াচাড়া করছে। এ দেখে বাবা মা উভয় ই তাকে পড়াতে মনস্থ হোন। কিছুদিন পর দেখা যায় যে,
তার বই খাতার উপর আগ্রহ প্রবল। এর মধ্যে তার বাবা বেকারত্ব খোচানোর জন্য একটি প্রাথমিক
স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন যার নাম- ‘খালাসী দূর্গাপুর আবুল হোসেন বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’
এবং সেখানে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। সে সুবাধে রকি বাড়ীতেই একাডমিক পড়াশুনা
করার সুযোগ পান। এভাবেই চলতে থাকে………….
রকি’র
বয়স যখন ৭ বছর তখন লক্ষ্য করা যায় যে, সে অল্প অল্প হাটতে পারে। তখন রকিকে নিয়ে তার
মা-বাবা’র মনে স্বপ্নের বীজ রোপন শুরু হয়। তার বাবা তাকে চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি করিয়ে
দেন। তারা সিন্ধান্ত নেই, যে করেই হোক রকিকে তারা কিছুটা পড়াশুনা করাবে। কিন্তু রকি
যখন চতুর্থ শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে উত্তৃর্ণ হলো তাদের ইচ্ছাশক্তি আরও
প্রবল ও মজবুত হলো। এরই সাথে রকি’র দুই নানু আছিয়া বেগম ও আনোয়ারা বেগম তাকে পড়ানোর
জন্য সর্বাত্মক সহযোগীতা করতে লাগলো। কিন্তু এখানেই রকি ১ম সামাজিক বাঁধার সম্মুখিন
হলো। সে জিলা স্কুলে চান্স পেলো কিন্তু প্রতিন্ধীতার জন্য তাকে ভর্তি নিলো না। পরে
সে স্থানীয় মোহন মিয়া জুনিয়র হাই স্কুলে ক্লাস সিক্সে ভর্তি হয়। সমস্যাটি শুরু হয়
এখানেই। কারণ সে চিয়ার টেবিলে ভালো মতো লিখতে পারে না। তাই তার জন্য শুধুমাত্র পরীক্ষার
সময় মেঝেতে পরীক্ষা দেওয়ার অনুমতি মেলে। সেখনেও সে বরাবরের মতো প্রথম-দ্বিতীয়-তৃতীয়’র
মধ্যে স্থান পায়। এভাবে ক্লাশ সেভেন পর্যন্ত চলতে থাকে। ক্লাশ এইটে সে আবারও জিলা স্কুলে
ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু এবারও সে ব্যার্থ হয়। এর পরে শহরের অন্যান্য দুইটি
স্কুলে ভর্তি হতে গেলে একই কারণে তারা রকিকে ভর্তি নেই না। পরে নানি আনোয়ারা বেগমের
অক্লান্তি প্রচেস্টার ফলে রকি ফরিদপুর শহরের ময়েজ উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে
ভর্তি হয় এবং তার থাকার ব্যবস্থা করা হয় স্কুলের হোস্টলে। কিন্তু হোস্টেলটি প্রতিবন্ধী
ব্যক্তিবান্ধব না হওয়ায় সেখানে বেশিদিন তার থাকা হয় না। তাই স্কুল থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার
দূরে বিলমামুদ পুর নানুর বাড়িতে তার স্থল হয়; যেখানে সে পুরোটা শৈশব কাটিয়েছেন। সেখানে
সে এক বছর থাকেন। কিন্তু এখান থেকে তার নিয়মিত ক্লাশ করতে অসুভিধা হতো। অন্যদিকে এখানে
প্রাইভেট শিক্ষক না পাওয়ায় সে পরে যায় বিপাকে। ফলে তার পড়াশুনার খানিকটা অবনতি ঘটতে
থাকে। এই সমস্যা তার বাবা বুঝতে পেরে তাকে তার খালা বাড়িতে থেকে পড়াশুনার ব্যবস্থা
করে। তখন তার খালাতো বোন পপি প্রায় শতাধিক ছাত্রছাত্রীকে প্রাইবেট পড়াতেন। রকি’ও তার
কাছে নিয়োমিত পড়তে শুরু করে। অবশেষে সে আনোয়ারা বেগমের একান্ত প্রচেস্টায় এসএসসি পরীক্ষায়
অংশ নেই। সে টেবিল চিয়ারে বসে দ্রুত লিখতে পারতো না। সে বাম পায়ে সাহায্য নিয়ে মেঝেতে
বসে বাম হাত দিয়ে লিখতো। ফলে তার প্রয়োজন পরে সিক-বেডে পরীক্ষা দেওয়ার। কিন্তু তখন
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কোনো আইন প্রণিত হয়নি। ফলে সিক বেড পেতে তাকে ও আনোয়ারা
বেগমকে অনেক বেগ পেতে হয়। অবশেষ সিক বেড রকি’র জন্য বরাদ্দ হয়। তার পরীক্ষা দেওয়ার
খবর সাংবাদিক গৌতম দাসের প্রচেষ্ঠায় প্রথম আলো ও নয়া দিগন্ত প্রত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
সে কতৃত্বের সাথে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তৃর্ণ
হয়।
২০০৭
সালে সে সফলতার সহিত উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা
পাশ করে এবং সরকারি রাজেন্দ্র কলেজে স্নাতকে সমাজ কল্যান বিভাগে ভর্তি হয়। এই সময় সে,
বিপ্লব কুমার মালো, এ টি এম মোসলেহ উদ্দিন তাহের, রমজান আলী, তামান্না আক্তার, জলি,
সামসুল হক আরও অনেকে মিলে তৈরি করে ফরিদপুর বহুমূখী প্রতিবন্ধী কল্যাণ সংস্থা। সেখনে
সে দীর্ঘ দিন সহকারি সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পড়াশুনার পাশাপশি এই সংগঠনকে এগিয়ে নিতে
আপ্রাণ চেষ্টা চালান। ২০১৪ সালে তিনি গ্রাজুয়েট ডিগ্রী লাভ করেন।
এরপর
রকি তার বাবার প্রতিষ্ঠিত রকি পোল্ট্রী ফার্মের কোষাদক্ষের দায়িত্ব নেন। বর্তমানে সে
সেখানেই কর্মরত আছেন। পাশাপাশি সে “রকি গ্রুপ” নামে একটি প্রতিষ্ঠান করতে যাচ্ছে। সেখানে
ব্যবসার পাশাপাশি সমাজিক কাজ সম্পাদানের জন্য থাকবে আলাদা কর্ণার। যেখানে প্রতিবন্ধী
ব্যক্তি ও প্রবীণদের জন্য উন্নয়নমূলক কাজ হবে। এর জন্য তার দরকার সকলের সহযোগীতা।
রকিবুলের
নিকট একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা চলে আসে। তিনি বলেন তার জীবন সংগ্রামের সফলতার পিছনে
অসামান্য অবদান রয়েছে তার বাবা, মা, দুই নানু, তার খালাতো বোন, তার শিক্ষকসহ অনেকেই।
তার ভবিষৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে সে বলে, আমার জীবনে অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নে কাজ করা। এর জন্য সে রকি গ্রুপের পাশাপশি সোসাইটি এ্যান্ড
হিউম্যান ইকুয়্যাল ডেভোলপম্যান্ট এ্যাকশন অব
বাংলাদেশ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়তে চাচ্ছেন।
তিনি
চ্যানেল দৃষ্টি ও তারুণ্যের আলো নামে পেজের এডিটর হিসেবে কাজ করছেন।
ব্যক্তিগতভাবে
তিনি এক ছেলে জনক।






কোন মন্তব্য নেই