আল্লাহর কাছে প্রিয় হতে হলে কেমন মানুষ হতে হবে? - চ্যানেল দৃষ্টি

Header Ads Widget

test banner

Breaking

Home Top Ad

Responsive Ads Here

Post Top Ad

Responsive Ads Here

শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২৬

আল্লাহর কাছে প্রিয় হতে হলে কেমন মানুষ হতে হবে?

আল্লাহর কাছে প্রিয় হতে হলে কেমন মানুষ হতে হবে—কুরআন ও হাদিসের আলোকে আত্মশুদ্ধির প্রতীকী দৃশ্য

প্রশংসার কোলাহল পেরিয়ে এক নীরব প্রশান্তির সন্ধানে

জীবন দৃষ্টি | চ্যানেল দৃষ্টি

রাত গভীর হলে পৃথিবীর কোলাহল একটু একটু করে থেমে আসে। দিনের ব্যস্ততা, মানুষের ভিড়, কথার শব্দ—সবকিছু ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে যায়। আর তখনই কখনো কখনো বুকের ভেতর থেকে এমন কিছু প্রশ্ন উঠে আসে, যেগুলোর উত্তর খ্যাতির আলোয় পাওয়া যায় না, মানুষের প্রশংসাতেও নয়। সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হয় নিজের ভেতরে, একান্ত নীরবতায়, যখন মানুষ অন্তরের আয়নায় নিজের মুখোমুখি দাঁড়ায়।

আমি আসলে কেমন মানুষ?

মানুষ আমাকে কীভাবে দেখে—তার কিছুটা হয়তো আমরা জানি। কেউ আমাদের ভালো মানুষ বলে, কেউ সফল, কেউ শিক্ষিত, কেউ দায়িত্বশীল। কারও কাছে আমরা প্রিয়, আবার কারও কাছে হয়তো অপছন্দের। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে মানুষের স্বীকৃতির মাপকাঠিও যেন আরও দৃশ্যমান হয়েছে। কতজন আমাদের চেনে, কতজন আমাদের অনুসরণ করে, কতজন আমাদের প্রশংসা করে—এসবও অনেক সময় আমাদের আত্মপরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে।

কিন্তু এসব পরিচয়ের ভিড় পেরিয়ে আরও একটি প্রশ্ন আছে। প্রশ্নটি খুব ছোট, কিন্তু তার গভীরতা অসীম—

আল্লাহ কি আমাকে ভালোবাসেন?


এই প্রশ্নের সামনে দাঁড়ালে মানুষের তৈরি অনেক হিসাবই যেন হঠাৎ ছোট হয়ে আসে। অর্থ, পদ, খ্যাতি, বাহ্যিক সৌন্দর্য কিংবা সামাজিক পরিচিতি—সবকিছুই একসময় পেছনে সরে যায়। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আল্লাহ মানুষের চেহারা ও সম্পদের দিকে তাকান না; বরং তিনি মানুষের অন্তর ও আমলের দিকে তাকান। —সহিহ মুসলিম, ২৫৬৪।

কথাটি আমাদের পরিচিত পৃথিবীর মাপকাঠিকে যেন অন্য এক আলোয় দেখায়। পৃথিবী যেখানে মানুষের বাহ্যিক সাফল্য দেখে, সেখানে আল্লাহ মানুষের অন্তর ও কাজের দিকে তাকান। তাই আল্লাহর কাছে প্রিয় হওয়ার আকাঙ্ক্ষা আসলে নিজের বাহ্যিক পরিচয়কে বড় করার আকাঙ্ক্ষা নয়; বরং নিজের ভেতরটাকে সুন্দর করার চেষ্টা।

আমরা কেউই ভুলহীন নই। মানুষের জীবনে ভুল আসে, দুর্বলতা আসে, কখনো কখনো এমন সিদ্ধান্তও আসে যার জন্য পরে নিজের কাছেই অনুশোচনা হয়। রাগের মুহূর্তে বলা একটি কথা, অন্যের প্রতি করা একটি অন্যায়, কোনো আমানতের ক্ষেত্রে অবহেলা, কিংবা নিজের প্রবৃত্তির কাছে কোনো এক মুহূর্তে পরাজয়—এসবই মানুষের জীবনের বাস্তবতা।

কিন্তু ভুলের পর একজন মানুষ কোন পথে ফিরে আসে, সেটিই হয়তো আরও গুরুত্বপূর্ণ।


কুরআন আমাদের এমন একটি আশার কথা জানায়, যা ভেঙে যাওয়া হৃদয়ের জন্যও দরজা খুলে রাখে—

“নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্রতা অবলম্বন করে তাদের ভালোবাসেন।” —সূরা আল-বাকারা, ২:২২২।

আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন—এই ঘোষণা মানুষের জন্য এক গভীর আশ্বাস। এর অর্থ এই নয় যে ভুল করা ভালো; বরং এর অর্থ হলো, ভুল মানুষকে শেষ করে দেয় না, যদি সে আন্তরিকভাবে ফিরে আসতে চায়। তওবা হলো নিজের ভুলকে স্বীকার করার সাহস, অন্যায় থেকে সরে আসার সংকল্প এবং আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা।

একজন মানুষ হয়তো অনেক দূরে চলে গেছে। কিন্তু ফিরে আসার পথ যদি সে খুঁজে নেয়, তবে সেই ফিরে আসাই তার জীবনের নতুন অধ্যায়ের শুরু হতে পারে। অন্ধকারে পড়ে থাকা নয়, অন্ধকার বুঝতে পেরে আলোর দিকে ফিরে আসাই মানুষের সৌন্দর্য।

আর আল্লাহর কাছে মানুষের মর্যাদা নির্ধারণের মাপকাঠিও পৃথিবীর প্রচলিত মাপকাঠির মতো নয়। পৃথিবী যেখানে অর্থ, ক্ষমতা, পরিচিতি ও প্রভাবকে বড় করে দেখে, কুরআন সেখানে তাকওয়াকে সামনে আনে।


আল্লাহ বলেন—

“নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত সে-ই, যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান।” —সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১৩।

তাকওয়া এমন একটি সৌন্দর্য, যার বড় অংশ মানুষের চোখে ধরা পড়ে না। একজন মানুষ যখন একা থাকে, তখন তার সামনে হয়তো অন্যায় করার সুযোগ আসে। কেউ জানবে না, কেউ দেখবে না, কেউ প্রশ্ন করবে না। তবু সে থেমে যায়—কারণ তার ভেতরে একটি বিশ্বাস কাজ করে, আল্লাহ দেখছেন।

সেই থেমে যাওয়া হয়তো কোনো সংবাদ হয় না। কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার প্রশংসা হয় না। কিন্তু একজন মানুষের চরিত্রের প্রকৃত পরিচয় অনেক সময় এমন নীরব সিদ্ধান্তেই প্রকাশ পায়।

তাই আল্লাহর ভালোবাসার পথ লোক দেখানোর পথ নয়। এটি এমন এক পথ, যেখানে মানুষের চোখের চেয়ে আল্লাহর দৃষ্টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

মানুষের চরিত্রের আরেকটি বড় পরীক্ষা আসে রাগের সময়। শান্ত অবস্থায় ভদ্র থাকা সহজ। কিন্তু যখন কেউ অপমান করে, বিশ্বাস ভেঙে দেয়, অন্যায় করে কিংবা আমাদের প্রিয় কোনো জায়গায় আঘাত করে, তখন আমাদের ভেতরের মানুষটি প্রকাশ পায়।

কুরআন এমন মানুষের প্রশংসা করেছে যারা রাগ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে। এরপর আল্লাহ বলেছেন, তিনি সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন। —সূরা আলে ইমরান, ৩:১৩৪।

কখনো কখনো সবচেয়ে বড় বিজয় অন্য কাউকে পরাজিত করা নয়; নিজের ক্রোধকে পরাজিত করা। একটি কঠিন কথা মুখে আসার আগেই থেমে যাওয়া, প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ পেয়েও নিজেকে সংযত রাখা, উত্তপ্ত মুহূর্তে কিছুক্ষণ নীরব থাকা—এসব ছোট মনে হলেও মানুষের চরিত্রে এর প্রভাব গভীর।

ক্ষমাও তেমনই একটি গুণ। ক্ষমা মানে অন্যায়কে সঠিক বলে মেনে নেওয়া নয়। যেখানে মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ণ হচ্ছে, সেখানে ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু ব্যক্তিগত প্রতিহিংসাকে নিজের হৃদয়ের স্থায়ী বাসিন্দা বানিয়ে রাখাও একজন মানুষকে ভেতর থেকে ক্লান্ত করে দেয়।

কখনো ক্ষমা অন্যকে মুক্ত করার চেয়ে নিজের হৃদয়কে মুক্ত করার পথ হয়ে ওঠে।

জীবনের আরেকটি বড় পরীক্ষা হলো ধৈর্য। কারণ জীবন সবসময় আমাদের ইচ্ছেমতো চলে না। কখনো দীর্ঘ অপেক্ষা আসে, কখনো একের পর এক দরজা বন্ধ হয়ে যায়, কখনো প্রিয় কিছু হারানোর ব্যথা বুকের ভেতর দীর্ঘদিন থেকে যায়। কারও জীবনে অর্থের সংকট, কারও জীবনে একাকিত্ব, কারও জীবনে শারীরিক সীমাবদ্ধতা, আবার কারও জীবনে সমাজের অবহেলা—প্রত্যেক মানুষের পরীক্ষার ধরন আলাদা।


কুরআন বলে—

“আর আল্লাহ ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন।” —সূরা আলে ইমরান, ৩:১৪৬।

সবর মানে কষ্ট না পাওয়া নয়। সবর মানে চোখের পানি লুকিয়ে রাখা নয়। সবর মানে কষ্টের মধ্যেও সঠিক পথ থেকে সরে না যাওয়ার চেষ্টা। যে মানুষ ভেঙে পড়েও আবার উঠে দাঁড়ায়, হতাশ হয়েও আবার চেষ্টা করে, দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্যেও অন্যায়ের পথ বেছে নেয় না—তার সেই নীরব দৃঢ়তার মূল্য আছে।

এই ধৈর্যের সঙ্গে আসে তাওয়াক্কুল—আল্লাহর ওপর নির্ভরতা। কুরআনে আল্লাহ বলেন, সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তাঁর ওপর ভরসা করতে; এবং তিনি ভালোবাসেন তাদের, যারা তাঁর ওপর ভরসা করে। —সূরা আলে ইমরান, ৩:১৫৯।

তাওয়াক্কুল মানে হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা করা, দায়িত্ব পালন করা, সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং তারপর ফলাফলের ভার আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া—এটাই তাওয়াক্কুলের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

কিন্তু আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কের সৌন্দর্য শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতে সীমাবদ্ধ থাকে না। সেই সম্পর্ক মানুষের আচরণেও প্রকাশ পাওয়ার কথা। সেজদায় যে মাথা নত হয়, তার প্রভাব যেন কথায় দেখা যায়। রোজা যে সংযম শেখায়, তার ছাপ যেন আচরণে পড়ে। কুরআন যে হৃদয়কে স্পর্শ করে, তার আলো যেন মানুষের সঙ্গে ব্যবহারে পৌঁছায়।


রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

“মুমিনদের মধ্যে ঈমানে সবচেয়ে পরিপূর্ণ সে, যার চরিত্র সবচেয়ে উত্তম।” —জামে তিরমিজি, ১১৬২।

সুন্দর চরিত্র তাই ইসলামের কোনো অতিরিক্ত অলংকার নয়; এটি ঈমানের সৌন্দর্যেরই অংশ।

আর একজন মানুষের চরিত্রের সবচেয়ে কাছের সাক্ষী কে? অনেক সময় তার নিজের পরিবারের মানুষগুলো।

বাইরের পৃথিবী হয়তো আমাদের হাসিমুখ দেখে। কিন্তু ঘরের মানুষ আমাদের রাগ দেখে, দুর্বলতা দেখে, ক্লান্তি দেখে। তাই বাইরে মানুষের সঙ্গে সুন্দর ব্যবহার করলেই চরিত্রের পরীক্ষা শেষ হয়ে যায় না। নিজের ঘরে আমরা কেমন—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।


রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।” —জামে তিরমিজি, ৩৮৯৫।

তাই পৃথিবী বদলানোর স্বপ্ন দেখার আগে নিজের ঘরের ভাষাটুকু একটু কোমল করা যায় কি না, সেটিও ভাবা দরকার।


দয়া ও কোমলতাও একজন মানুষের সৌন্দর্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কঠিন পৃথিবীতে কোমল থাকা কখনো কখনো সাহসের বিষয়। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “যে কোমলতা থেকে বঞ্চিত, সে কল্যাণ থেকে বঞ্চিত।” —সহিহ মুসলিম, ২৫৯২।

দয়া শুধু অর্থ দিয়ে সাহায্য করার নাম নয়। দয়া হলো কাউকে অকারণে অপমান না করা। বৃদ্ধ মানুষের কথা ধৈর্য নিয়ে শোনা। শিশুর ভুলকে ভালোবাসা দিয়ে সংশোধন করা। বিপদে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়ানো। এমন একজনের হাত ধরে দাঁড়ানো, যার পাশে দাঁড়ানোর মতো আর কেউ নেই।

আর দয়া হলো একজন প্রতিবন্ধী মানুষকে শুধু করুণার চোখে না দেখে মর্যাদা, অধিকার ও সমান সুযোগের চোখে দেখা। তাঁর সীমাবদ্ধতাকে নয়, তাঁর সামর্থ্যকে দেখতে শেখা। তাঁর প্রয়োজনকে বোঝা। তাঁর চলার পথকে সহজ করা। তাঁকে সমাজের বোঝা নয়, সমাজের একজন পূর্ণাঙ্গ অংশ হিসেবে গ্রহণ করা।

কারণ একটি সমাজ কতটা মানবিক, তার পরিচয় অনেক সময় বোঝা যায় সে তার সবচেয়ে দুর্বল মানুষগুলোর সঙ্গে কেমন আচরণ করে।

আল্লাহর ভালোবাসার পথে ন্যায়ও একটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ। ন্যায় করা সহজ, যতক্ষণ ন্যায় আমাদের পক্ষে থাকে। কিন্তু যখন সত্য বললে নিজের ক্ষতি হতে পারে, যখন আপনজন ভুল করেছে, যখন অপছন্দের মানুষটি সত্য কথা বলেছে—তখন ন্যায়ের পাশে দাঁড়ানোই আসল পরীক্ষা।


কুরআনে বলা হয়েছে—

“নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন।” —সূরা আল-মায়িদা, ৫:৪২।


ন্যায় শুধু আদালতের বিষয় নয়। পরিবারে ন্যায়, কর্মক্ষেত্রে ন্যায়, ব্যবসায় ন্যায়, সম্পর্কের ক্ষেত্রে ন্যায়, দুর্বল মানুষের প্রতি ন্যায়—সবই মানুষের চরিত্রের অংশ।

তবে ভালো কাজ করতে করতেও মানুষ কখনো কখনো নিজের জন্য একটি নতুন বিপদ তৈরি করে—অহংকার।

মানুষ যখন কিছু ভালো কাজ করে, জ্ঞান অর্জন করে, ইবাদত করে, মানুষের উপকার করে, তখন অজান্তেই তার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে—“আমি কি অন্যদের চেয়ে ভালো?”

এই প্রশ্নের মধ্যেই আত্মশুদ্ধির জন্য সতর্কবার্তা রয়েছে।

আমরা জানি না আমাদের কোন আমল আল্লাহর কাছে কবুল হয়েছে। আমরা জানি না যাকে আমরা ছোট মনে করছি, আল্লাহর কাছে তার অবস্থান কত উঁচু। তাই জ্ঞান বাড়লে বিনয় বাড়া উচিত। সামর্থ্য বাড়লে দায়িত্ববোধ বাড়া উচিত। ইবাদত বাড়লে অহংকার নয়, কৃতজ্ঞতা বাড়া উচিত।

কুরআনে আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের একটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে বলেন—

“আর পরম দয়াময়ের বান্দারা তারা, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে…” —সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৬৩।


আল্লাহর নৈকট্যের সৌন্দর্য হয়তো এখানেই—মানুষ যত নিজের রবকে চিনতে শেখে, তত নিজের সীমাবদ্ধতাও বুঝতে শেখে।

আল্লাহর প্রিয় হওয়া তাই কোনো একদিনের অর্জন নয়। এটি প্রতিদিনের পথচলা।

আজ একটি মিথ্যা বলা থেকে বিরত থাকা। আজ কারও প্রাপ্য ফিরিয়ে দেওয়া। আজ রাগের মুহূর্তে নিজেকে থামানো। আজ কাউকে ক্ষমা করার চেষ্টা করা। আজ নিজের ভুল স্বীকার করা। আজ কোনো অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো। আজ আল্লাহর কাছে ফিরে আসা।

এই ছোট ছোট সিদ্ধান্তগুলোই একদিন জীবনের বড় পরিবর্তনের কারণ হতে পারে।

কারণ মানুষ একদিনে বদলায় না।

মানুষ বদলায় প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্তে।


একদিন হয়তো আমরা বুঝতে পারব—আল্লাহর কাছে প্রিয় হওয়ার জন্য আমাদের পৃথিবীর সবার কাছে পরিচিত হওয়ার প্রয়োজন ছিল না। প্রয়োজন ছিল এমন একজন মানুষ হওয়ার, যাকে আল্লাহ চেনেন তার সত্যতার জন্য; তার তওবার জন্য; তার ধৈর্যের জন্য; তার ন্যায়ের জন্য; তার দয়ার জন্য; তার সুন্দর চরিত্রের জন্য।

একদিন মানুষের প্রশংসার সব শব্দ থেমে যাবে। যে পরিচয় নিয়ে আমরা এত গর্ব করি, সেটিও পৃথিবীর কাছে পড়ে থাকবে। অর্থ, পদ, খ্যাতি, বাহ্যিক সৌন্দর্য—সবকিছুরই একদিন শেষ আছে।

  • তখন সঙ্গে থাকবে আমাদের আমল।
  • থাকবে আমাদের চরিত্র।
  • থাকবে মানুষের প্রতি আমাদের আচরণ।
  • থাকবে আমাদের অন্তরের সত্যতা।
  • আর থাকবে আল্লাহর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক।

তাই জীবনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়তো এটি নয়—“মানুষ আমাকে কতটা ভালোবাসে?”

এর চেয়েও বড় প্রশ্ন—

“আল্লাহ কি আমার ওপর সন্তুষ্ট?”


এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে অন্যের দিকে তাকানোর আগে নিজেকেই আয়নার সামনে দাঁড় করাতে হবে।

  • আমার ইবাদত কি আমার চরিত্রকে সুন্দর করছে?
  • আমার জ্ঞান কি আমাকে আরও বিনয়ী করছে?
  • আমার সামর্থ্য কি আমাকে দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়াতে শেখাচ্ছে?
  • আমার কষ্ট কি আমাকে ধৈর্যশীল করছে?
  • আমার ভুল কি আমাকে তওবার দিকে ফিরিয়ে নিচ্ছে?
  • আমার কথায় কি কেউ অকারণে আহত হচ্ছে?
  • আমার উপস্থিতিতে কি একজন দুর্বল মানুষ নিরাপদ বোধ করে?
  • আমি কি মানুষের মর্যাদাকে সম্মান করি?

আর সবচেয়ে বড় কথা—

আমি কি শুধু মানুষের চোখে ভালো হতে চাই, নাকি আল্লাহর কাছেও ভালো হতে চাই?

হয়তো আল্লাহর ভালোবাসার পথ কোনো সুদূরের পথ নয়। হয়তো সেই পথ শুরু হয় খুব ছোট একটি জায়গা থেকে—নিজের ভুল স্বীকার করা দিয়ে।

তারপর ধীরে ধীরে নিজেকে সংশোধন করা, মানুষের অধিকার রক্ষা করা, রাগ সংযত করা, ক্ষমা করা, দয়া করা, ন্যায়ের পাশে দাঁড়ানো, অহংকার থেকে দূরে থাকা এবং প্রতিটি কাজে আল্লাহকে স্মরণ করা।

এই পথের শেষ কোথায়, আমরা জানি না। কিন্তু প্রতিটি সৎ পদক্ষেপ একজন মানুষকে নিজের আরও সুন্দর সংস্করণের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

আর সেই যাত্রাই হতে পারে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর “দৃষ্টি বদলের অভিযাত্রা”।

কারণ সত্যিকারের পরিবর্তন সবসময় পৃথিবী বদলানোর মধ্য দিয়ে শুরু হয় না।

কখনো কখনো একটি হৃদয় বদলালেই একটি পৃথিবী বদলাতে শুরু করে।

আল্লাহ আমাদের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করুন, আমাদের ভুলগুলো ক্ষমা করুন, আমাদের চরিত্রকে সুন্দর করুন, মানুষের হক আদায় করার তাওফিক দিন এবং আমাদের তাঁর প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন।

আমিন।

চ্যানেল দৃষ্টি
তথ্য জানাবে, দৃষ্টি বদলাবে।


শতর্কবার্তা- এখানে একটি কথা মনে রাখা জরুরি—আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের বিষয়টি শুধু কিছু সুন্দর গুণের তালিকা পূরণ করার নাম নয়; এটি ঈমান, তাকওয়া, ইখলাস, ফরজ ইবাদত, তওবা, ন্যায়পরায়ণতা এবং মানুষের হক আদায়ের সমন্বিত পথ। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে কোনো বিষয় বোঝার ক্ষেত্রে একটি আয়াত বা একটি হাদিসকে তার সামগ্রিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়। বিশেষ করে আকিদা, ইবাদত, হালাল-হারাম বা শরিয়তের বিধানসংক্রান্ত বিষয়ে নির্ভরযোগ্য আলেম ও স্বীকৃত ইসলামী জ্ঞানসূত্রের ব্যাখ্যা গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য কোনো ফতোয়া প্রদান নয়; বরং কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত কিছু নৈতিক ও আত্মশুদ্ধির শিক্ষা নিয়ে আত্মপর্যালোচনার একটি সুযোগ তৈরি করা। আল্লাহর কাছে কে কতটা প্রিয়—তার চূড়ান্ত বিচার একমাত্র আল্লাহই জানেন। তাই নিজের আমলকে অন্যের ওপর শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি না বানিয়ে, বরং প্রত্যেকের উচিত নিজের অন্তর, আচরণ ও দায়িত্বের দিকে ফিরে তাকানো।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Post Bottom Ad

Responsive Ads Here

পৃষ্ঠাসমূহ