মোঃ রকিবুল
ইসলাম, সম্পাদক ও কলামিস্ট, চ্যানেল দৃষ্টি
পৃথিবীর
ইতিহাসে এমন কিছু মানুষের
জন্ম হয়, যাঁদের জীবন
কেবল নিজেদের বেঁচে থাকার সীমানায় আবদ্ধ থাকে না; বরং
তাঁদের অদম্য সংগ্রাম, দর্শন ও কর্মধারা সমাজ
ও রাষ্ট্রের গণ্ডি পেরিয়ে পুরো বিশ্বজুড়ে লাখো-কোটি মানুষের জীবনের
পথপ্রদর্শক হয়ে ওঠে।
মাথার উপর নানা
প্রতিবন্ধকতা আর সেই প্রতিবন্ধতাকে অতিক্রম করে নিজের প্রতিষ্ঠানের বানানো হুইল চেয়ারে
চরে নেতৃত্ব দিচ্ছে- বিশ্ব দরবারে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার, সুরক্ষা, অংশগ্রহণ
ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায়- তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতীক অঙ্গনে সমানতালে এগিয়ে চলছে। বলছি;
সেই কালজয়ী যোদ্ধা, সকল বাধাকে ক্ষ্যান্ত করে অগ্রীয়মান সৈনিক ও বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর মহত
আবদুস সাত্তার দুলালের কথা। তিনি নিজে হেটে
চলতে না পারলেও মানবাধিকার ও প্রতিবন্ধী অস্তিত্ব ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় কালজয়ী অবদান
রেখেছেন। নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিশ্ব দরবারে। তিনি বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতি (BPKS)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং ২০২৫ সালের
সেপ্টেম্বর থেকে বিশ্ব প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতিনিধিত্বকারী
আন্তর্জাতিক সংগঠন Disabled Peoples’
International (DPI)-এর বিশ্ব সভাপতি।
একটি দুর্ঘটনা
সারা জীবনের কান্না হয়ে উঠতে পারতো, একটি পতন
হয়তো তাঁর জীবনের সব
স্বপ্ন থামিয়ে দিতে পারত। কিন্তু সেই
বেদনাময় চোখের অশ্রুকে তিনি বৃথা যেতে
দেননি। সেই অশ্রুকে পরিণত
করেছেন সংকল্পে, আর সেই সংকল্পই
তাঁকে নিয়ে গেছে বিশ্বের চূড়ায়।
স্বপ্ন দেখিয়েছে লাখো প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে-
বেঁচে থাকার, এগিয়ে যাওয়ার, স্বাধিকার আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার।
১৯৬০ সালে জন্ম
হয় এই অদম্য জীবন যোদ্ধা আবদুস সাত্তার দুলালের। শৈসবে তার ঘুরে বেড়ানোর কথা ছিল, স্কুলে
যাওয়ার কথা ছিল, বন্ধুদের
সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার কথা ছিল, খোলা
মাঠে দৌড়ানোর কথা ছিল। কিন্তু এক দুর্ঘটনা তাকে আবদ্ধ করার চেষ্টা করে।
মাত্র ১৫ বছর বয়সে
একটি গাছ থেকে পড়ে
যাওয়ার ঘটনা তাঁর জীবনের
সব হিসাব পাল্টে দেয়। তাকে ঠেলে দেয় মৃত্যুর
দোরগোড়ায়। ৪২ দিন কোমায় থাকার পর শুরু হলো সাত
বছরের দীর্ঘ পুনর্বাসনের পথ। সেই পথ
পেরিয়ে তিনি ঠিকই বেঁচে ফিরলেন, কিন্তু তাঁর শরীরে থেকে
গেল স্থায়ী শারীরিক প্রতিবন্ধিতা আবরণে। চলার জন্য হুইলচেয়ার
হয়ে উঠল তাঁর নিত্যসঙ্গী।
কিন্তু
কোনো কোনো জীবনে হুইলচেয়ার
পথ থামায় না; বরং পথের
অর্থই বদলে দেয়। আবদুস
সাত্তার দুলালের ক্ষেত্রেও যেন তাই হলো।
সেই দীর্ঘ সংকটের সময় তাঁর পাশে
ছিলেন মা নূর নাহার।
ছেলের জীবন নিয়ে উৎকণ্ঠায়
তিনি নির্ঘুম প্রার্থনা করতেন।
সেই
সাত বছরের প্রতিটি রাত জুড়ে এক
মা নির্ঘুম প্রার্থনায় বসে থাকতেন — নূর
নাহার। তার মুখে বারবার
উচ্চারিত হতো একটি আকুতি
— "আল্লাহ যেন আমার অসহায়
সন্তানের জন্য একটা পথ
খুলে দেন।" সেই প্রার্থনা যেন
আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে এক
বিস্ময়কর যাত্রায়, যেখানে সেই "অসহায় সন্তান" আজ কথা বলেন
বিশ্বমঞ্চে, প্রতিনিধিত্ব করেন ১৩০ কোটি
মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে।
দুর্ঘটনা
তাঁর শরীরকে বদলে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু
তাঁর চিন্তাকে থামাতে পারেনি। বরং নিজের জীবনের
অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি ধীরে ধীরে
বুঝতে শুরু করেন—মানুষের
জীবনে প্রতিবন্ধকতা কেবল শরীরে থাকে
না; সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি, বৈষম্য, সুযোগের অভাব এবং সিদ্ধান্ত
গ্রহণের প্রক্রিয়ার বাইরেও একজন মানুষকে পিছিয়ে
দেওয়া যায়। আর সেখান থেকেই
তাঁর জীবনের নতুন অধ্যায়ের শুরু।
১৯৮২ সালে তিনি সক্রিয়ভাবে
প্রতিবন্ধী অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। তখন তাঁর
সামনে ছিল দীর্ঘ পথ,
কিন্তু সেই পথের শেষ
কোথায়—তা হয়তো তিনি
নিজেও জানতেন না।
তিনি শুধু নিজেকে
নিয়ে ভাবেননি। তার মতো অসংখ্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমাজের মূল স্রোতধারায় সম্পৃক্তকরণের
লক্ষ্যে ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশ
প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতি—বিপিকেস। এটি ছিল শুধু
একটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার ঘটনা নয়; ছিল
প্রতিবন্ধী মানুষকে নিয়ে প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে একটি সংগঠিত পদক্ষেপ।
এটি প্রতিবন্ধী মানুষের দ্বারা এবং প্রতিবন্ধী মানুষের
জন্য কাজ করা একটি
সংগঠন। তিনি এখানে প্রধান নির্বাহী হিসেবে কাজ
শুরু করেন। তাঁর
নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার, সামগ্রিক উন্নয়ন, আত্মনির্ভরতা এবং অংশগ্রহণকে সামনে
রেখে কাজ করতে থাকে।
একটি
প্রতিষ্ঠান দিয়ে তাঁর সংগঠন গড়ার
গল্প শেষ হয়নি। বরং
সেখান থেকে তৈরি হতে
থাকে একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক।
তিনি প্রায় ৩০টি সিভিল সোসাইটি
সংগঠন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এর মধ্যে রয়েছে
National Alliance of Disabled People’s Organizations—NADPO এবং Women with Disabilities
Development Foundation—WDDF।
তাঁর ভাবনায় প্রতিবন্ধী মানুষ কেবল সাহায্য নেওয়ার
মানুষ নন; তাঁরা নিজেদের
অধিকার নিয়ে কথা বলবেন, নিজেদের
সংগঠন গড়বেন এবং নিজেদের উন্নয়নের
নেতৃত্ব দেবেন। এই দর্শন থেকেই জন্ম নেয় Persons with Disabilities Self-Initiative
to Development—PSID মডেল।
নামের মধ্যেই যার দর্শন—প্রতিবন্ধী
মানুষের নিজেদের উদ্যোগে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাওয়া।
এই মডেল বাংলাদেশের ৩৩টি
জেলায় ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রতিবন্ধী
মানুষের নিজস্ব সংগঠন ও নেতৃত্বকে শক্তিশালী
করার একটি পদ্ধতি হিসেবে
ব্যবহৃত হয়। এর মাধ্যমে
বিপুলসংখ্যক প্রতিবন্ধী মানুষ সংগঠিত ও ক্ষমতায়িত হওয়ার
সুযোগ পেয়েছেন।
আবদুস
সাত্তার দুলালের সংগ্রামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় নীতিনির্ধারণের
টেবিলে। তিনি বুঝেছিলেন, শুধু
মাঠে আন্দোলন করলেই হবে না; যে
আইন, নীতি ও পরিকল্পনা
একজন প্রতিবন্ধী মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে, সেগুলোর টেবিলেও
তাঁদের কণ্ঠ পৌঁছাতে হবে।
সেই লক্ষ্যেই শুরু হয় দীর্ঘ
অ্যাডভোকেসির পথ। বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী মানুষের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গঠিত প্রায় ৫০টি
সরকারি কমিটির সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন।
১৯৮৬ সাল থেকে তিনি
৫৬৫টিরও বেশি উচ্চপর্যায়ের অ্যাডভোকেসি
বৈঠকে অংশ নিয়েছেন বলে
প্রতিষ্ঠানটি জানায়। এই বৈঠকগুলোতে রাষ্ট্রের
সর্বোচ্চ পর্যায়ের বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে
প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার ও উন্নয়নের বিষয়
নিয়ে আলোচনা হয়েছে।১৯৮৮ সালের পর দায়িত্ব পালন
করা প্রতিটি রাষ্ট্রপতি, সব প্রধানমন্ত্রী, গুরুত্বপূর্ণ
মন্ত্রী, প্রধান বিচারপতি, প্রধান নির্বাচন কমিশনার, মানবাধিকার কমিশন, আইন কমিশন, সরকারি
কর্ম কমিশন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, কূটনীতিক এবং দেশ-বিদেশের
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনের সঙ্গে তাঁর অ্যাডভোকেসি যোগাযোগ
হয়েছে। ১৯৯৬ সালের অ্যাকশন প্ল্যান, ২০০১ ও ২০১৩
সালের আইন এবং ২০১১
সালের বাংলাদেশ ন্যাশনাল স্কিলস ডেভেলপমেন্ট পলিসিসহ বিভিন্ন জাতীয় নীতি ও পরিকল্পনায়
প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার ও স্বার্থ অন্তর্ভুক্ত
করার ক্ষেত্রে তাঁর মুখ্য ভূমিকা ছিলো।
একজন
মানুষ কতবার কথা বলতে পারেন?
কতজন মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের কথা বলতে পারেন?
কতটি দরজা কড়া নাড়তে
পারেন? আবদুস সাত্তার দুলালের জীবনের উত্তর যেন সংখ্যার মধ্যেই
লুকিয়ে আছে। শত শত
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠান,
সভা, সম্মেলন, প্রশিক্ষণ ও আলোচনায় তিনি
কখনো ব্যবস্থাপক, কখনো বক্তা, কখনো
উপস্থাপক, কখনো নেতা হিসেবে
অংশ এসব কাজের বিস্তৃতি
ছিল জাতিসংঘ, DPI, WHO, ADB, CBM,
ILO, Handicap International, বিশ্বব্যাংক,
বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, সরকার, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, AUSAID, USAIDসহ বহু প্রতিষ্ঠান
ও সংস্থার সঙ্গে।
বাংলাদেশের
মাটি থেকে তাঁর এই
কণ্ঠ ধীরে ধীরে পৌঁছে
যায় বিশ্বের নানা প্রান্তে। তাঁর
আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা বিস্তৃত হয় ৭১টি দেশে।
বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে তিনি বিভিন্ন
আন্তর্জাতিক সভা ও মঞ্চে
বক্তব্য দিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকার, পানামার
রাষ্ট্রপতি এবং অস্ট্রেলিয়ার পার্লামেন্টের
প্রতিনিধিদের সঙ্গে একই মঞ্চে বক্তব্য
দেওয়ার সুযোগও তাঁর জীবনীতে উল্লেখ
করা হয়েছে।
জাতিসংঘের
সঙ্গেও তাঁর দীর্ঘ সম্পৃক্ততার
গল্প রয়েছে। ১৯৯২ সাল থেকে
তিনি জাতিসংঘে প্রতিবন্ধী অধিকারবিষয়ক বিশেষজ্ঞ হিসেবে স্বেচ্ছায় কাজ করে আসছেন।
UNESCAP-এর High-Level
Intergovernmental Meeting in Korea- তাঁকে
২০১২ সালে
(২৯ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর,
২০১২-এর সভায়) ‘Disability Rights Champion’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ধীরে ধীরে তার আন্তর্জাতিক কাজের পরিধিকে আরও বিস্তৃত ঘটতে থাকে। UNESCAP-এর ১৯৯৩–২০৩২
সময়পর্বের প্রতিবন্ধী-অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন এজেন্ডার বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর অবদানের কথা
সেখানে বলা হয়েছে। Sustainable Development Goals—SDGs, UN
Convention on the Rights of Persons with Disabilities—UNCRPD, Asian Development
Bank-এর Poverty and
Social Development Papers, WHO-এর
World Report on Disability এবং
Australia’s Development for All policy-এর
মতো আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ও নীতিগত কাঠামোর
সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে।
কিন্তু
আবদুস সাত্তার দুলালের জীবন শুধু সম্মেলন
আর নীতির কাগজে আটকে ছিল না।
তাঁর লড়াই পৌঁছেছিল খেলার মাঠেও। ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশের
জাতীয় পর্যায়ের হুইলচেয়ার দৌড়ে তিনি প্রথম পুরস্কার
অর্জন করেন। স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের
দাবা প্রতিযোগিতাতেও তিনি প্রথম স্থান
অর্জন করেন। এরপর ১৯৯৫ সালে
অস্ট্রেলিয়ায় একটি আন্তর্জাতিক দাবা
প্রতিযোগিতায় তৃতীয় স্থান অর্জন করেন। হুইলচেয়ার তাঁর কাছে শুধু
চলার উপকরণ হয়ে থাকেনি; সেটিই
কখনো হয়ে উঠেছে প্রতিযোগিতার
সঙ্গী, কখনো সংগ্রামের বাহন।
জীবনের
এই দীর্ঘ সংগ্রামের পাশে ছিল তাঁর
পরিবারও। তার জীবনসঙ্গিনী নিজেও গুরুতর প্রতিবন্ধিতার সঙ্গে জীবনযাপন করেন। তাঁদের রয়েছে দুই সন্তান। একজন
মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের এই বাস্তবতাও তাঁর
চিন্তা ও কাজের জগতের
সঙ্গে যেন অদৃশ্য এক
সুতোয় বাঁধা—যেখানে প্রতিবন্ধিতা কোনো করুণা পাওয়ার
পরিচয় নয়; বরং অধিকার,
মর্যাদা, ভালোবাসা, পরিবার, স্বপ্ন এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণেরও
অংশ।
সময়ের
সঙ্গে তাঁর দায়িত্বও বেড়েছে।
তিনি BPKS-এর Founder & CEO, NADPO-এর President, প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার ও টেকসই উন্নয়নের
Global Advisor, Billion Strong Organization-এর
Bangladesh Representative, Disability Power Index-এর Global Advisory Council-এর সদস্য এবং
Workability Asia/International-এর
Board Director হিসেবে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশে
প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার ও সেবাবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর
সভাপতিত্বে গঠিত Steering Committee-এর সদস্য হিসেবেও
তাঁর ভূমিকার কথা বিপিকেসের জীবনীতে
রয়েছে। পাশাপাশি তিনি BPKS Consumer Ltd.-এর Chairman এবং দেশ-বিদেশের
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরামর্শক হিসেবেও কাজ করেছেন।
প্রতিষ্ঠানগুলো
গড়ার সেই দীর্ঘ যাত্রায়
বিপিকেসও বড় হয়েছে। বিপিকেসের
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তাঁর
নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ২৫টি বিদেশি অর্থায়নভিত্তিক
প্রকল্প পরিচালনা করেছে, যার মোট মূল্য
প্রায় ১৫ মিলিয়ন মার্কিন
ডলার। একই সূত্রে প্রতিষ্ঠানটির
বর্তমান সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১৩ মিলিয়ন মার্কিন
ডলার বলে উল্লেখ করা
হয়েছে। এসব সংখ্যা বিপিকেসের
নিজস্ব প্রকাশিত সাংগঠনিক তথ্য—স্বাধীন নিরীক্ষার
ফল হিসেবে নয়।
তারপর
এল
২০২৫
সাল।
যে
বছর
তাঁর
জীবনের
গল্পে
যুক্ত
হলো
এক
নতুন
অধ্যায়।
১৯
সেপ্টেম্বর ২০২৫।
Disabled Peoples’ International—DPI-এর একটি
Extraordinary General Meeting। সেখানে
বাংলাদেশি আবদুস
সাত্তার দুলাল
সভাপতি
নির্বাচিত হলেন।
The Asian Age-এর
প্রতিবেদনে বলা
হয়েছে,
তিনি
এ
নির্বাচনে এশিয়া
ও
এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করছিলেন। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা—BSS-ও
১৯
সেপ্টেম্বরের বিশেষ
সাধারণ
সভায়
তাঁর
সভাপতি
নির্বাচিত হওয়ার
খবর
প্রকাশ
করে। ১৯৮১ সালে
কানাডার উইনিপেগে প্রতিষ্ঠিত DPI বিশ্বজুড়ে প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও অন্তর্ভুক্তির জন্য
কাজ করে। The Asian Age-এর প্রতিবেদনে সংগঠনটির
১৪০টি জাতীয় অ্যাসেম্বলি এবং ছয়টি আঞ্চলিক
অ্যাসেম্বলির কাঠামোর কথা উল্লেখ করা
হয়েছে। এই সংগঠনের বিশ্ব
সভাপতি হিসেবে একজন বাংলাদেশির নির্বাচিত
হওয়া তাই তাঁর ব্যক্তিগত
জীবনের পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী অধিকার আন্দোলনের আন্তর্জাতিক উপস্থিতিরও একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
কিন্তু
এই
জায়গায় এসে
গল্পটি
যেন
আবার
ফিরে
যায়
সেই
১৫
বছর
বয়সী
কিশোরটির কাছে।–
- গাছ
থেকে
পড়ে
যাওয়া
সেই
শরীর।
- ৪২
দিনের
অন্ধকার কোমা।
- সাত
বছরের
পুনর্বাসন।
- মায়ের
প্রার্থনা।
- তারপর
হুইলচেয়ার।
- সেই
হুইলচেয়ার কি
তবে
তাঁর
সীমাবদ্ধতার প্রতীক
ছিল?
- নাকি
সেটিই
হয়ে
উঠেছিল
তাঁর
নতুন
জীবনের
প্রথম
বাহন?
- উত্তরটা হয়তো
তাঁর
চার
দশকের
বেশি
সময়ের
কাজের
মধ্যেই
রয়েছে।
- তিনি
হাঁটতে পারেননি, কিন্তু তিনি এগিয়েছেন।
- তিনি
দৌড়াতে পারেননি আগের মতো, কিন্তু
হুইলচেয়ার দৌড়ে জাতীয় পর্যায়ে প্রথম হয়েছেন।
তিনি
হয়তো নিজের পায়ে সভার মঞ্চে উঠতে
পারেননি, কিন্তু সেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে
বিশ্বের নীতিনির্ধারকদের সামনে প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলেছেন।
তিনি
একা নিজের জীবনের জন্য পথ খুঁজে
থামেননি; বরং চেষ্টা করেছেন
এমন একটি পথ তৈরি
করতে, যেখানে তাঁর মতো আরও
মানুষ নিজেদের অধিকার নিয়ে দাঁড়াতে পারেন।
তাঁর
জীবন
তাই
কেবল
একটি
দুর্ঘটনা থেকে
উঠে
আসার
গল্প
নয়।
এটি
একটি
দৃষ্টিভঙ্গির বিবর্তনের গল্প।
একটি
ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা কীভাবে
সামাজিক আন্দোলনের শক্তিতে রূপ
নিতে
পারে—আবদুস সাত্তার দুলালের জীবন
তারই
এক
দীর্ঘ
উদাহরণ।
একদিন
যে
মা
সন্তানের জন্য
প্রার্থনা করেছিলেন—“আল্লাহ
যেন
আমার
অসহায়
সন্তানের জন্য
একটা
পথ
খুলে
দেন”—সেই সন্তানের জীবনের
পথ
শেষ
পর্যন্ত কত
দূর
গিয়েছে, তার
হিসাব
হয়তো
কোনো
একটি
সংখ্যায় দেওয়া
সম্ভব
নয়।
একটি
হুইলচেয়ার থেকে
শুরু
হয়ে
সেই
পথ
পৌঁছেছে বাংলাদেশের গ্রাম-শহর, নীতিনির্ধারণের টেবিল,
জাতীয়
ও
আন্তর্জাতিক সম্মেলন, জাতিসংঘের অঙ্গন,
৭১টি
দেশ
এবং
শেষ
পর্যন্ত Disabled Peoples’ International-এর বিশ্ব নেতৃত্বে।
তবু
তাঁর
গল্পের
সবচেয়ে বড়
শক্তি
হয়তো
পদ-পদবি কিংবা পুরস্কারে নয়।
শক্তিটা রয়েছে
সেই
সিদ্ধান্তে—অশ্রুকে সংকল্পে পরিণত
করার
সিদ্ধান্তে।
একটি
দুর্ঘটনা তাঁকে
থামাতে
চেয়েছিল। একটি
হুইলচেয়ার তাঁকে
নতুন
করে
চলতে
শিখিয়েছিল। আর
একটি
দৃঢ়
সংকল্প
তাঁকে
নিজের
জীবনের
সীমা
ছাড়িয়ে অন্য
মানুষের অধিকার
প্রতিষ্ঠার পথে
নিয়ে
গিয়েছিল।
আবদুস
সাত্তার দুলাল
তাই
শুধু
একজন
প্রতিবন্ধী অধিকারকর্মীর নাম
নয়;
তিনি
বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী অধিকার
আন্দোলনের দীর্ঘ
পথচলার
একটি
গুরুত্বপূর্ণ মুখ।
তিনি শুধু অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের নির্মাতাই নন, তিনি নিজেই একটি
প্রতিষ্ঠান, তিনি
শুধু একজন সংগঠকই নন, অনেক সংগঠকদের আইকোন।
তিনি শুধু একজন
অ্যাডভোকেটই নন, একজন
আন্তর্জাতিক নেতা।
এবং
সর্বোপরি—নিজের
জীবনকে
একটি
বৃহত্তর মানবাধিকারের প্রশ্নের সঙ্গে
যুক্ত
করে
দেওয়া
এক
অদম্য
যোদ্ধার নাম।
হুইলচেয়ার তাঁর
চলার
পথ
বদলেছে,
কিন্তু
গন্তব্য ঠিক
করে
দেয়নি। গন্তব্য ঠিক
করেছে
তাঁর
সংকল্প। আর
সেই
সংকল্পের পথ
ধরেই
বাংলাদেশ থেকে
বিশ্বমঞ্চে পৌঁছেছে আবদুস
সাত্তার দুলালের কণ্ঠ।




কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন