ডিগ্রি আছে, কর্ম নেই—শিক্ষিত তরুণদের ৩৬% বেকার, ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন - চ্যানেল দৃষ্টি

Header Ads Widget

test banner

Breaking

Home Top Ad

Responsive Ads Here

Post Top Ad

Responsive Ads Here

বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ডিগ্রি আছে, কর্ম নেই—শিক্ষিত তরুণদের ৩৬% বেকার, ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন





 মোঃ রকিবুল ইসলাম, চ্যানেল দৃষ্টি | বিশেষ প্রতিবেদন

শিক্ষা জাতির মেরুদ্বন্দ। অথচ সে শিক্ষাই বাঙ্গালীদের অন্ধকার ও হতাশার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

শিক্ষা শেষ করে একজন তরুণ যখন কর্মজীবনে প্রবেশের প্রস্তুতি নেন, তখন স্বাভাবিক প্রত্যাশা থাকে—শিক্ষা ও দক্ষতার ভিত্তিতে তিনি একটি উপযুক্ত কাজের সুযোগ পাবেন ও একটি উজ্জল ক্যরিয়ার। কিন্তু বাস্তবতা সবসময় সেই প্রত্যাশার সঙ্গে মেলে না।

সম্প্রতি বাংলাদেশের শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থান পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF)  বিশ্লেষণে উঠে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ একটি চিত্র। IMF-এর সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর Finance & Development ম্যাগাজিনে প্রকাশিত “Graduating into Uncertainty” শীর্ষক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার তুলনামূলকভাবে বেশি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী পোস্ট-সেকেন্ডারি শিক্ষা সম্পন্ন তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ৩৬ শতাংশ। সুত্র: IMF — Graduating into Uncertainty

অর্থাৎ, এই নির্দিষ্ট বয়স ও শিক্ষাগত শ্রেণির চাকরিপ্রার্থী তরুণদের মধ্যে প্রতি ১০০ জনে প্রায় ৩৬ জন কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন না।

তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—৩৬ শতাংশ বাংলাদেশের সব শিক্ষিত মানুষের বেকারত্বের হার নয়। এটি ১৫–২৪ বছর বয়সী এবং পোস্ট-সেকেন্ডারি শিক্ষা সম্পন্ন, শ্রমবাজারে থাকা তরুণদের একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর হিসাব।


🎓 ডিগ্রি থাকলেই কি চাকরি নিশ্চিত?

উচ্চশিক্ষা একজন তরুণের জ্ঞান ও যোগ্যতা বাড়ায়। কিন্তু বর্তমান শ্রমবাজারে শুধু শিক্ষাগত সনদ অনেক ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়।

যোগাযোগ দক্ষতা, প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা, সমস্যা সমাধান, বাস্তব অভিজ্ঞতা, ভাষাগত দক্ষতা এবং নির্দিষ্ট পেশাগত দক্ষতার মতো বিষয়ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

IMF-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এশিয়ার বিভিন্ন দেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণরা তাদের যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়ছেন। একই সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও নিয়োগদাতাদের চাহিদার মধ্যে দক্ষতার অমিল বা skills mismatch একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে।

তাই প্রশ্নটি শুধু— “চাকরি নেই কেন?”

এখানেই শেষ নয়। আরও একটি প্রশ্ন হলো—

শিক্ষা শেষ করার পর যে দক্ষতা চাকরির বাজারে প্রয়োজন, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা কি সেই দক্ষতার সঙ্গে যথেষ্টভাবে যুক্ত হতে পারছে?


📊 ৩৬ শতাংশের তথ্যটি কী বলছে?

IMF-এর সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর Finance & Development ম্যাগাজিনে প্রকাশিত বিশ্লেষণে দক্ষিণ এশিয়ার উচ্চশিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থান পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে।

সেখানে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের হার প্রায় ৩৬ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় প্রায় ৪৩ শতাংশ উল্লেখ করা হয়েছে। একই বিশ্লেষণে ভারতের ক্ষেত্রেও উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের হার উচ্চ বলে দেখানো হয়েছে।

তবে বিভিন্ন বেকারত্বের পরিসংখ্যান তুলনা করার সময় বয়সসীমা, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং কোন জনগোষ্ঠীকে হিসাবের মধ্যে রাখা হয়েছে—এসব বিষয় বিবেচনা করা জরুরি।

বাংলাদেশের আরেকটি IMF হিসাব

বাংলাদেশের ২০২৪ সালের Labour Force Survey-ভিত্তিক IMF-এর আলাদা বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে সামগ্রিক বেকারত্বের হার ছিল ৩.৬৯ শতাংশ। ১৫–২৯ বছর বয়সী তরুণদের বেকারত্ব ছিল ৮.৪৯ শতাংশ।

একই বিশ্লেষণে ১৫–২৯ বছর বয়সী উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব ২৫.৭ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এখানে ২৫.৭ শতাংশ এবং প্রায় ৩৬ শতাংশ—দুটি সংখ্যার মধ্যে পার্থক্যের কারণ হলো বয়সসীমা, শিক্ষাগত শ্রেণি ও পরিমাপের সংজ্ঞা এক নয়। তাই এই সংখ্যাগুলোকে একই সূচক হিসেবে সরাসরি তুলনা করা ঠিক হবে না।


🏭 শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের দূরত্ব

বাংলাদেশ নিয়ে IMF-এর ২০২৬ সালের Country Report-এ বলা হয়েছে, দেশে শিক্ষার হার বাড়লেও বিদ্যমান শিল্প কাঠামোর মধ্যে সেই হারে উচ্চমানের কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি। ফলে বিশেষ করে তরুণ ও উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানের চাপ তৈরি হচ্ছে।

IMF-এর বিশ্লেষণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পখাতের মধ্যে আরও কার্যকর সংযোগ, দক্ষতা প্রশিক্ষণ, apprenticeship বা শিক্ষানবিশ কর্মসূচি এবং STEM শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

অর্থাৎ, শিক্ষা থেকে কর্মসংস্থানে যাওয়ার পথটি শুধু ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যমে শেষ হচ্ছে না; বরং শিক্ষা → দক্ষতা → বাস্তব অভিজ্ঞতা → কর্মসংস্থান—এই পুরো ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।


💻 প্রযুক্তি ও AI: নতুন সুযোগ, নাকি নতুন চাপ?

কর্মসংস্থানের পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI।

IMF-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, AI অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে। তবে প্রযুক্তি গ্রহণের গতি যদি কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির চেয়ে দ্রুত হয়, তাহলে বিশেষ করে তরুণদের শ্রমবাজারে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।

তবে AI-এর প্রভাবকে শুধু চাকরি কমে যাওয়ার দৃষ্টিতে দেখাও যথেষ্ট নয়। IMF-এর প্রতিবেদনে উৎপাদনশীল প্রযুক্তির কর্মসংস্থানে মিশ্র প্রভাবের কথা বলা হয়েছে—কিছু কাজের চাহিদা কমতে পারে, আবার উৎপাদনশীলতা বাড়ার ফলে বিনিয়োগ, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং নতুন ধরনের কাজের সুযোগও তৈরি হতে পারে।

তাই ভবিষ্যতের কর্মজীবনে প্রযুক্তিকে এড়িয়ে যাওয়ার পরিবর্তে প্রযুক্তির সঙ্গে কাজ করার সক্ষমতা তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।


🚀 তরুণদের জন্য কোন দক্ষতাগুলো গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে?

পরিবর্তনশীল শ্রমবাজারের বাস্তবতায় তরুণরা কয়েকটি ক্ষেত্রে নিজেদের প্রস্তুত করতে পারেন—

১. শুধু ডিগ্রির ওপর নির্ভর না করা
শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি ব্যবহারিক ও পেশাগত দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা করা।

২. ডিজিটাল দক্ষতা বাড়ানো
কম্পিউটার, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ডেটা, AI এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি সম্পর্কে ব্যবহারিক ধারণা তৈরি করা।

৩. যোগাযোগ দক্ষতা উন্নত করা
বাংলা ও ইংরেজি—দুই ভাষাতেই কার্যকর লেখা, কথা বলা ও উপস্থাপনের দক্ষতা গড়ে তোলা।

৪. বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করা
ইন্টার্নশিপ, প্রকল্প, স্বেচ্ছাসেবা, ফ্রিল্যান্সিং বা বাস্তব কাজের মাধ্যমে দক্ষতা প্রয়োগের সুযোগ তৈরি করা।

৫. উদ্যোক্তা ও স্বনির্ভর কর্মসংস্থানের পথ বিবেচনা করা
চাকরির পাশাপাশি ব্যবসা, ফ্রিল্যান্সিং ও অন্যান্য বৈধ স্বনির্ভর কর্মসংস্থানের সুযোগও বিবেচনা করা যেতে পারে।


♿ প্রতিবন্ধী তরুণদের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ আরও বিস্তৃত

কর্মসংস্থানের এই আলোচনায় প্রতিবন্ধী তরুণদের বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে।

একজন প্রতিবন্ধী তরুণ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করলেও যদি তার জন্য Accessible শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, সহায়ক প্রযুক্তি, যাতায়াত, কর্মপরিবেশ এবং নিয়োগের সুযোগ যথেষ্ট না থাকে, তাহলে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কর্মসংস্থানে প্রবেশ কঠিন হতে পারে।

তাই অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থানের বিষয়টি শুধু একটি চাকরির সুযোগ তৈরি করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

এর সঙ্গে যুক্ত—

যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ + Accessibility + প্রয়োজনীয় সহায়তা + মর্যাদা + সমান অংশগ্রহণ।

চ্যানেল দৃষ্টির দৃষ্টিভঙ্গিতে, তরুণদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে প্রতিবন্ধী ও অপ্রতিবন্ধী—সব তরুণের জন্য শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করা প্রয়োজন।


🌱 শিক্ষা থেকে কর্মসংস্থান—দূরত্ব কমাতে হবে

একজন তরুণ বছরের পর বছর শিক্ষা গ্রহণ করেন। কিন্তু শিক্ষা শেষ করার পর যদি তিনি দেখতে পান যে তাঁর শেখা বিষয় ও চাকরির বাজারের প্রয়োজনের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে, তাহলে সেখানে শুধু ব্যক্তির ব্যর্থতা হিসেবে বিষয়টিকে দেখা যথেষ্ট নয়।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশিক্ষণব্যবস্থা, শিল্পখাত, নিয়োগদাতা এবং নীতিনির্ধারকদের মধ্যে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সংযোগ আরও কার্যকর করা প্রয়োজন—এমন বিষয়ও IMF-এর বাংলাদেশবিষয়ক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

কারণ একটি দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়। তারা একই সঙ্গে ভবিষ্যতের কর্মী, উদ্যোক্তা, উদ্ভাবক এবং নেতৃত্বের শক্তি।

তাই প্রশ্নটা শুধু—

“তরুণরা চাকরি পাচ্ছে না কেন?”

এর পাশাপাশি প্রশ্ন হওয়া দরকার—

শিক্ষা কি কর্মবাজারের সঙ্গে যথেষ্টভাবে যুক্ত হচ্ছে?

তরুণরা কি ভবিষ্যতের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে?

প্রযুক্তি ও AI-এর পরিবর্তনের জন্য তারা কতটা প্রস্তুত?

প্রতিবন্ধী তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের দরজা কতটা উন্মুক্ত?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা শুধু তরুণদের ভবিষ্যতের জন্য নয়—বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সমাজের ভবিষ্যতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

চ্যানেল দৃষ্টি

তথ্য জানাবে, দৃষ্টি বদলাবে।

সূত্র: International Monetary Fund (IMF), Finance & Development, September 2026; IMF Bangladesh Country Report No. 26/024, 2026.


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Post Bottom Ad

Responsive Ads Here

পৃষ্ঠাসমূহ